উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার সীমান্তে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। দক্ষিণ কোরিয়ার বিরুদ্ধে প্রচার চালাতে চলতি অক্টোবরের শেষ নাগাদ সীমান্তজুড়ে লাউডস্পিকার স্থাপনের প্রস্তুতি শেষ করার ঘোষণা দিয়েছে উত্তর কোরিয়া। একই সঙ্গে নিজেদের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপ কিংবা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে দক্ষিণ কোরিয়াকে কঠোর পরিণতির হুঁশিয়ারি দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে সীমান্তের প্রতিরক্ষা ও দুর্গ নির্মাণ এলাকা পরিদর্শন শেষে কিম ইয়ো জং জানান, অক্টোবরের শেষ নাগাদ লাউডস্পিকার স্থাপনের কাজ সম্পন্ন হবে। এ সময় তিনি আরও দাবি করেন, উত্তর কোরিয়ার সামরিক ইউনিটগুলো ইতোমধ্যে কৌশলগত অবস্থান নিয়েছে।
কিম ইয়ো জং সতর্ক করে বলেন, উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়া হস্তক্ষেপ চালিয়ে গেলে দেশটিকে ভয়াবহ ও দুর্ভোগপূর্ণ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে। তাঁর অভিযোগ, দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্তে মাইকের মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচার করেছে এবং বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে। তবে সিউলের বক্তব্য, তাদের গুলিবর্ষণ ছিল আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ।
দক্ষিণ কোরিয়ার সেনাদের উদ্দেশে কিম ইয়ো জং আরও বলেন, সতর্কতামূলক গুলির কারণে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সামরিক সদস্যের সামান্য ক্ষতিও হলে তার জবাব দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে দক্ষিণ কোরিয়ার বাহিনীর প্রতি কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
উত্তর কোরিয়ার এই বক্তব্যের পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা ও একত্রীকরণ মন্ত্রণালয়।
সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগে নতুন বাধা
উত্তর কোরিয়ার লাউডস্পিকার স্থাপনের পরিকল্পনা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে মিয়ংয়ের সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। গত বছরের জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তিনি পিয়ংইয়ংয়ের সঙ্গে বিরোধ কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ চালিয়ে আসছেন। কিন্তু সাম্প্রতিক হুমকি ও সীমান্তে পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে দুই দেশের সম্পর্ক আবারও চাপে পড়েছে।
অতীতে দুই কোরিয়াই সীমান্ত এলাকায় লাউডস্পিকার ব্যবহার করে একে অপরের বিরুদ্ধে প্রচার চালিয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার সম্প্রচারে কে-পপ সংগীত ও আন্তর্জাতিক সংবাদ প্রচার করা হতো, যা উত্তর কোরিয়ার সরকারকে ক্ষুব্ধ করত। এর জবাবে পিয়ংইয়ংও সীমান্তে নিজস্ব লাউডস্পিকার চালু করত।
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে অস্ত্রবিরতি চুক্তির মাধ্যমে। এরপর দুই দেশের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয় ডিমিলিটারাইজড জোন বা অসামরিকীকৃত অঞ্চল। তবে যুদ্ধের পর সাত দশকের বেশি সময় পার হলেও দুই দেশের বৈরিতা পুরোপুরি দূর হয়নি।
২০২৪ সাল থেকে সীমান্ত এলাকায় সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করেছে উত্তর কোরিয়া। মাইন পুঁতে রাখা, ব্যারিকেড নির্মাণ ও কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের মতো পদক্ষেপের মাধ্যমে সীমান্তে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করছে দেশটি। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে স্থায়ী সীমান্ত প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেও পিয়ংইয়ং কাজ করছে বলে জানা গেছে।
মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে দুই দেশের বিরোধ
সীমান্তে উত্তেজনার মধ্যেই মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে দুই কোরিয়ার মধ্যে নতুন করে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ শুরু হয়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার দাবি, অসামরিকীকৃত অঞ্চলে উত্তর কোরিয়ার নতুন করে মাইন পুঁতে রাখার কারণে গত মাসে একটি বিস্ফোরণ ঘটে। এতে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হন।
তবে এ ঘটনায় নিজেদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে উত্তর কোরিয়া। পিয়ংইয়ংয়ের বক্তব্য, দক্ষিণ কোরিয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং সাজানো।
ঘটনাটি নিয়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। প্রস্তাবিত চিঠিতে বিস্ফোরণের জন্য উত্তর কোরিয়ার পুঁতে রাখা মাইনকে দায়ী করার পরিকল্পনা রয়েছে সিউলের। দক্ষিণ কোরিয়ার মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড কোরীয় যুদ্ধের অস্ত্রবিরতি চুক্তির গুরুতর লঙ্ঘন।
এ ঘটনায় উত্তর কোরিয়ার আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবিও জানাবে দক্ষিণ কোরিয়া। তবে একই সঙ্গে সীমান্তে সংঘাতের ঝুঁকি না বাড়িয়ে আলোচনার মাধ্যমে বিরোধ মেটানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সিউল।
লাউডস্পিকার স্থাপনের প্রস্তুতি, মাইন বিস্ফোরণ নিয়ে বিরোধ এবং সামরিক পাল্টা পদক্ষেপের হুঁশিয়ারি—সব মিলিয়ে দুই কোরিয়ার সীমান্ত পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।



