tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়অপ্রতীম হত্যার নেপথ্যে কী, রহস্য উদঘাটনে মাঠে পাঁচ বাহিনী

অপ্রতীম হত্যার নেপথ্যে কী, রহস্য উদঘাটনে মাঠে পাঁচ বাহিনী

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম (১৩) হত্যাকাণ্ডে চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। মাত্র একদিন আগে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয়েছিল সপ্তম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী। পরদিন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হয় তার মরদেহ।

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে কী ছিল—আইফোন ছিনতাই, পূর্ববিরোধ, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য—তা খতিয়ে দেখছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। প্রাথমিকভাবে কোটবাড়ী-সালমানপুর এলাকার কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের সম্পৃক্ততার বিষয়টিও তদন্তে এসেছে। অপ্রতীমের মায়ের ওপর ক্ষুব্ধ কোনো চক্র এ ঘটনায় জড়িত কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

হত্যার রহস্য উদঘাটনে পুলিশ, ডিবি, সিআইডি, পিবিআই ও স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক ইউনিট মাঠে কাজ করছে। এরই মধ্যে ছবি তোলার প্রলোভন দেখিয়ে অপ্রতীমকে পাহাড়ি এলাকায় নিয়ে যাওয়ার একটি সিসিটিভি ফুটেজও সামনে এসেছে। ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তুহিন নামের এক কিশোরকে আটক করেছে পুলিশ।

যেভাবে নিখোঁজ অপ্রতীম

এর আগে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে সদর দক্ষিণ থানাধীন ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের কোটবাড়ী এলাকার বাসা থেকে মায়ের আইফোন নিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে ছবি তুলতে বের হয় অপ্রতীম। এরপর আর বাড়ি ফেরেনি সে।

স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তার সন্ধান না পেয়ে ওইদিনই সদর দক্ষিণ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা কেএম ফিরোজ শাহরিয়ার। নিখোঁজের পর থেকেই অপ্রতীমকে উদ্ধারে স্বজনদের পাশাপাশি পুলিশও তৎপর হয়ে ওঠে। তার সর্বশেষ অবস্থান এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে পুলিশ।

ছবি তোলার কথা বলে পাহাড়ে

অনুসন্ধানে জানা যায়, শুক্রবার প্রথমে ছবি তোলার প্রলোভন দেখিয়ে তুহিন নামের এক কিশোর গ্যাং সদস্য অপ্রতীমকে পাহাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে আনাছ নামের আরেক কিশোরসহ আরও কয়েকজনের অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, ওই এলাকায় একটি চক্র আগে থেকেই অবস্থান করছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। সেখানে অপ্রতীমকে মারধর ও শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। পরে তার সঙ্গে থাকা আইফোন ও মানিব্যাগ নিয়ে মরদেহটি পাহাড়ের একটি ডালে ফেলে রেখে যায় হত্যাকারীরা।

তবে হত্যার প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত নয়। আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল—তা খতিয়ে দেখছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো।

মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের প্রসঙ্গ

অপ্রতীমের মা ড. নাহিদা বেগম কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। তিনি স্বামী ও একমাত্র সন্তানকে নিয়ে কোটবাড়ী গন্ধমতি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি-মার্চে এক মাসের জন্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রক্টর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।

স্থানীয়দের ভাষ্য, ২০২৫ সালের ১ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বসে মাদক সেবনের সময় সালমানপুর এলাকার আট কিশোরকে আটক করেছিলেন শিক্ষার্থীরা। পরে প্রক্টর নাহিদা বেগম তাদের পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। ওই সময় সালমানপুরের মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে মিলন ও আল আমিনের নাম আলোচনায় আসে।

এ ঘটনার জেরে স্থানীয় কিশোর গ্যাং ও মাদকচক্রের কেউ কেউ নাহিদা বেগমের ওপর ক্ষুব্ধ থাকতে পারে—এমন আলোচনা স্থানীয় পর্যায়ে রয়েছে। তবে ওই ঘটনার সঙ্গে অপ্রতীম হত্যার সরাসরি যোগসূত্র এখনো তদন্তে প্রমাণিত হয়নি।

জঙ্গল থেকে উদ্ধার মরদেহ

শনিবার দুপুরে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ‘ম্যাজিক প্যারাডাইস পার্ক’-এর পেছনের একটি জঙ্গল থেকে অপ্রতীমের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

মরদেহের প্রথম প্রত্যক্ষদর্শী আবদুল কাদের জিলানী বলেন, তারা বাঁশ কাটার জন্য ওই এলাকায় গিয়েছিলেন। আনুমানিক সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে তার ছেলে ওই স্থানে কেউ ঘুমিয়ে আছে বলে জানায়। পরে কাছে গিয়ে ভালোভাবে খেয়াল করে তারা অপ্রতীমকে দেখতে পান। তার মাথায় জখমের চিহ্নও ছিল। বিষয়টি জানতে পেরে তারা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে খবর দেন।

মরদেহ উদ্ধারের পর তা কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।

একাধিক সন্দেহভাজন জিজ্ঞাসাবাদে

কুমিল্লার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আনিসুজ্জামান বলেন, হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত সন্দেহে একাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। অপ্রতীম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই পুলিশের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে। তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ একাধিক ক্লু পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

পুলিশ সুপার বলেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে শুধু আইফোন ছিল, নাকি অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল, তা দ্রুত উদঘাটনের চেষ্টা চলছে। ঘটনায় যতজনই জড়িত থাকুক, তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সদর দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রকিবুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কয়েকজন পুলিশের হেফাজতেও রয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না।

পাঁচ বাহিনীর তৎপরতা

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক আবদুল হাকিম বলেন, ঘটনার পর থেকেই পুলিশ, ডিবি, স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)সহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে অপ্রতীমকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তার সঙ্গে থাকা মায়ের আইফোনটিও এখনো পাওয়া যায়নি।

তদন্তে পুলিশ, ডিবি, সিআইডি, পিবিআই ও এসআরবির বিভিন্ন ইউনিট যুক্ত হওয়ায় হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় এবং ঘটনার পুরো ধারাবাহিকতা উদঘাটনে একযোগে কাজ চলছে।

বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা। তারা অপ্রতীম হত্যায় জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

নিহতের মা ড. নাহিদা বেগম বলেন, কী কারণে তার একমাত্র ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে, তা তিনি জানেন না। তিনি হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।

নিহতের মা-বাবাকে সান্ত্বনা দিতে ঘটনাস্থলে ছুটে যান কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী।

তদন্তে এখন বড় প্রশ্ন

অপ্রতীমের সঙ্গে থাকা আইফোনটি এখনো উদ্ধার হয়নি। ফলে আইফোন ছিনতাইয়ের উদ্দেশ্যেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে কি না, সেটি তদন্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি অপ্রতীমকে কীভাবে পাহাড়ি এলাকায় নেওয়া হলো, সেখানে কারা আগে থেকে অবস্থান করছিল, কারা হত্যায় অংশ নিয়েছিল এবং তার মায়ের সঙ্গে পূর্বের কোনো বিরোধের যোগসূত্র রয়েছে কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে দ্রুত হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের কথা জানানো হয়েছে। এখন তদন্তের পরবর্তী অগ্রগতি ও আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ থেকে অপ্রতীম হত্যার প্রকৃত কারণ ও জড়িতদের বিষয়ে কতটা স্পষ্ট তথ্য বেরিয়ে আসে, সেটিই দেখার বিষয়।

উল্লেখ্য, ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতীম বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী। সে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম ও কেএম ফিরোজ শাহরিয়ারের একমাত্র সন্তান।