tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিককাদার স্তূপ থেকে একের পর এক লাশ উদ্ধার, মৃত্যু ৩৯২ ছাড়িয়েছে

কাদার স্তূপ থেকে একের পর এক লাশ উদ্ধার, মৃত্যু ৩৯২ ছাড়িয়েছে

হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ ধস থেকে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে নেপাল ও চীনের তিব্বত অঞ্চলে মৃতের সংখ্যা ৩৯০ ছাড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ। আকস্মিক বন্যায় নদীর পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে এসে জনপদ, শহর ও উপত্যকার বিস্তীর্ণ এলাকা বিধ্বস্ত হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) উদ্ধারকারীরা কাদা ও ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে অভিযান চালান। নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে অন্তত ৩৮৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। প্রতিবেশী চীনের তিব্বত অঞ্চলে নিহত হয়েছেন অন্তত তিনজন। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা ৩৯২।

চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, দুর্যোগের এক দিন পর বৃহস্পতিবার বিকেলে তিব্বতের ভূমিধসকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং। এ সময় তিনি জরুরি উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশনা দেন।

নেপালের পুলিশ ও পর্যটন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দেশটিতে নিখোঁজ ৯১০ জনের মধ্যে ৫০০ জনের বেশি বিদেশি নাগরিক। দুই ডজনের বেশি দেশের নাগরিক ও পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ভারতের ১৭৭ জন, যুক্তরাষ্ট্রের ৯০ জন, অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন, যুক্তরাজ্যের ৩৩ জন এবং কানাডার ২৫ জন রয়েছেন।

চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে ১০০ জন চীনা নাগরিক রয়েছেন।

অন্যদিকে, তিব্বতের গিরং কাউন্টিতে ৫৫৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি। তাঁদের মধ্যে ২৬০ জন বিদেশি নাগরিক।

দুর্যোগকবলিত এলাকায় পৌঁছানোই এখন উদ্ধারকারীদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডু থেকে আল-জাজিরার প্রতিবেদক মিনেল ফার্নান্দেজ জানিয়েছেন, সড়ক ও সেতুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণে দুর্গম এলাকাগুলোতে পৌঁছে জীবিতদের উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।

সরকারি ও বেসরকারি কয়েকটি হেলিকপ্টার উদ্ধারকাজে যুক্ত হয়েছে। এসব হেলিকপ্টারে দুর্গম এলাকা থেকে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার পাশাপাশি খাবার, ওষুধ ও অন্যান্য জরুরি সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, আহতদের মধ্যে পাঁজর ভেঙে যাওয়া ও ত্বকে দগ্ধ হওয়ার মতো গুরুতর আঘাত রয়েছে।

নেপালে হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় আটকে পড়া মানুষের সন্ধান ও উদ্ধার অভিযান চলছে। এলাকাটি তিব্বতের লাসা থেকে কাঠমান্ডু যাতায়াতকারী পর্যটক, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের কাছে জনপ্রিয়।

বুধবারের ভিডিও ফুটেজে দ্রুতগতির পানি, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে গিরং সীমান্তবর্তী এলাকায় কয়েক ডজন মানুষ ভেসে যাওয়ার দৃশ্য দেখা গেছে। সংবাদ সংস্থাগুলো ফুটেজটির সত্যতা যাচাই করেছে। নেপালের দিকে নদীর নিম্নপ্রবাহে বহু ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

নেপালের দুর্যোগ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বন্যার পানিতে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদটির পানি ক্রমেই বাড়ছে এবং যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

নেপাল সেনাবাহিনীর মুখপাত্র রাজা রাম বাসনেত জানিয়েছেন, প্রতিবেশী ভারত সরবরাহ করা তাঁবু, খাবার ও ওষুধ হেলিকপ্টারের মাধ্যমে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে ৫ হাজারের বেশি সেনা ও পুলিশ সদস্য অংশ নিয়েছেন।

বন্যার কারণে ভারতের নেপাল সীমান্তবর্তী বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কয়েকটি এলাকা থেকেও হাজারো মানুষকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বন্যার পানি গান্ডাক নদীর অববাহিকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর একটি নুয়াকোটের বিদুরের পরিস্থিতি দেখতে সড়কপথে রওনা হয়েছেন বলে তাঁর কার্যালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছে।

যেভাবে শুরু হলো বিপর্যয়

প্রাথমিকভাবে নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পের কারণে ওই এলাকায় হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানিয়েছে, শুরুতে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প হিসেবে যে কম্পন রেকর্ড করা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ আকস্মিকভাবে ধসে পড়ার ফলে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি। এরপরই বিপুল পরিমাণ পাথর, বরফ ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষের প্রবল স্রোত নেমে আসে।

প্ল্যানেট ল্যাবসের প্রাথমিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণেও দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের একটি ভূমিধসের কারণে লেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষসহ প্রবল স্রোত তৈরি হয়। ঘটনাস্থলটি নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাড়ি সীমান্ত পারাপার কেন্দ্র থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে।

দুর্যোগকবলিত উপত্যকাগুলোতে ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন ঘন কাদায় ঢেকে গেছে। আকাশ থেকে ধারণ করা ছবিতে ধসে পড়া বাড়ি, পানিতে ডুবে থাকা গাড়ি এবং প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি ধাতব সেতু দেখা গেছে।

রাসুওয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকি বলেন, ‘যেদিকেই তাকাই, ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর পাশের বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।’

দুর্যোগের সময় তিব্বতের কৈলাস পর্বত ও মানসসরোবর হ্রদে তীর্থযাত্রায় থাকা লোকজনও বিপদের মধ্যে পড়েছেন। হিন্দু ও বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে উচ্চভূমির এসব স্থান পবিত্র হিসেবে বিবেচিত।

আন্তর্জাতিক সহায়তা

ভয়াবহ এই দুর্যোগে নেপালের পাশে দাঁড়িয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, তারা দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ে একজন পরামর্শককে নেপালে পাঠাচ্ছে। পাশাপাশি জরুরি সহায়তা হিসেবে ৫ লাখ মার্কিন ডলার দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বন্যাকে ‘ভয়াবহ’ উল্লেখ করে জানিয়েছেন, কানাডার কর্মকর্তারা পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক দপ্তরের প্রধান টম ফ্লেচার জানিয়েছেন, নেপালের ত্রাণ কার্যক্রমে জাতিসংঘের বৈশ্বিক জরুরি তহবিল সিইআরএফ থেকে ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ দেওয়া হবে।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এর আগে জানিয়েছিলেন, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর কাছে জরুরি ত্রাণসামগ্রী ও সহায়তাকর্মী পাঠানো হচ্ছে।

অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেছেন, দুর্গম এলাকায় স্থানীয় অবকাঠামো ও সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি

এই ভয়াবহ বন্যা জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নেপালের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টিও সামনে এনেছে বলে মনে করেন জলবায়ু ও জননীতি বিশেষজ্ঞ সুনীল আচার্য।

কাঠমান্ডু থেকে তিনি বলেন, এটি শুধু একটি অনির্দেশ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; জলবায়ু সংকটের সম্মুখসারিতে বসবাসের বাস্তবতা এই বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে নির্মমভাবে ফুটে উঠেছে।

তাঁর মতে, এ ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালের একার পক্ষে কার্যকরভাবে প্রস্তুতি নেওয়া কঠিন। জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় দেশটির পর্যাপ্ত সম্পদ নেই। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে ভবিষ্যতে এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করা প্রয়োজন।

সূত্র: আল-জাজিরা