২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র আন্দোলন দমনকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ তিনজনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিয়েছেন শহীদ শেখ মেহেদী হাসান জুনায়েদের মা সোনিয়া জামাল। তিনি মামলাটিতে ১৬ নম্বর সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি প্রদান করেন।
বুধবার (২০ আগস্ট) বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ট্রাইব্যুনাল-১–এর দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে তার সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা সম্পন্ন হয়। অন্য বিচারক ছিলেন মো. শফিউল আলম মাহমুদ।
সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে সোনিয়াকে জেরা করেন শেখ হাসিনার পক্ষে রাষ্ট্রীয় খরচে নিযুক্ত আইনজীবী মো. আমির হোসেন। জেরার সময় আইনজীবী প্রশ্ন করেন, সোনিয়া কেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছেন, এবং কীভাবে নিশ্চিত হয়েছেন যে তারা গুলির নির্দেশ দিয়েছেন। জবাবে সোনিয়া বলেন, ‘সোশ্যাল মিডিয়া ও বিবিসির সংবাদে এসব তথ্য পেয়েছি।’
জবানবন্দিতে সোনিয়া বলেন, “আমার একমাত্র ছেলে জুনায়েদ (১৪), গেন্ডারিয়ার উইল পাওয়ার স্কুলের সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ছিল। সে ১০ পারা কোরআনের হাফেজ ছিল। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট চানখারপুল এলাকায় ছাত্র আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হয়।”
তিনি জানান, ৫ আগস্ট সকালে জুনায়েদ তাকে বলে, বন্ধু সিয়ামকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলনে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ পর তিনি নিজেও মেয়ে নাফিসা নাওয়ালকে নিয়ে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ এলাকায় আন্দোলনে যোগ দিতে রওনা দেন। পথে পুলিশ রিকশা আটকে দেয়, তবে ‘মৃত আত্মীয় দেখতে যাচ্ছেন’ বলায় তাকে যেতে দেওয়া হয়।
দুপুর ১২টার দিকে আন্দোলনে পৌঁছানোর পর এক ঘণ্টা পেরোতেই ভাইয়ের ফোনে জানতে পারেন জুনায়েদ আহত হয়েছে। বাসায় ফিরে দেখেন, ছেলে মাথায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে আছে। “বাম চোখের কোণ দিয়ে গুলি লেগে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে গেছে। রক্তে ভেসে যাচ্ছিল পুরো শরীর,” বলেন তিনি।
সোনিয়া জানান, শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটের বিপরীত পাশের ফুটপাথে গুলিবিদ্ধ হয়ে তার ছেলে মারা যায়। বন্ধু সিয়াম ও আব্দুর রউফ তাকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান, সে আগেই মারা গেছে। জানাজা শেষে তাকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার এবং চানখারপুল এলাকার এডিসি আক্তারুল ইসলামের নেতৃত্বে কনস্টেবল সুজন, ইমাজ ও নাসিরুল ওইদিন বেপরোয়া গুলি চালায়। এতে জুনায়েদসহ আরও কয়েকজন নিহত হন। এসব তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মাধ্যমে তিনি জেনেছেন বলে জানান।
সাক্ষ্য দেওয়ার সময় আব্দুর রউফ প্রদত্ত একটি ভিডিও ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করা হয়, যেখানে জুনায়েদের মরদেহ শনাক্ত করেন সোনিয়া। ভিডিওতে তার বাম চোখে রক্তাক্ত ব্যান্ডেজ দেখা যায়। এই দৃশ্য দেখে আদালতে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
জেরার একপর্যায়ে আইনজীবী আমির হোসেন প্রশ্ন করেন, “আপনি অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে এসব বলছেন না তো?” জবাবে সোনিয়া বলেন, “আমার একমাত্র ছেলেকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমি মা। সন্তানের মৃত্যু কেবল মা-ই বোঝে। আপনি কী বুঝবেন?”
জেরা শেষে সোনিয়া বলেন, “আমি আমার ছেলেকে অনেক কষ্ট করে মানুষ করেছিলাম। ও বেঁচে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু সুযোগ দেওয়া হয়নি।”
মামলার পরবর্তী সাক্ষ্যগ্রহণের তারিখ পরে জানানো হবে বলে ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে।



