দেশে ফিরে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছরের বেশি সময় পর গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় মা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে হারিয়ে গভীর শোকে নিমজ্জিত হন তারেক রহমান। তবে দেশ ও জাতির স্বার্থে সেই শোককে শক্তিতে রূপান্তর করে আবারও সক্রিয় রাজনীতিতে নিজেকে নিয়োজিত করেন তিনি।
বর্তমানে নিয়মিত রাজধানীর গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে অফিস করছেন তারেক রহমান। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জোট শরিক এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে সাক্ষাৎ করছেন তিনি। এসব বৈঠকে সমসাময়িক রাজনীতির পাশাপাশি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন, নির্বাচন-পরবর্তী রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের পথসহ গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ব্যস্ততার মধ্যেও সময় পেলে আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গেও দেখা করছেন তিনি।
এই ব্যস্ত কর্মসূচির ফাঁকে দীর্ঘ ১৯ বছর পর আগামী ১১ জানুয়ারি পৈতৃক জেলা বগুড়া সফরে যাবেন তারেক রহমান। দুই দিনের এই সফরে তিনি বগুড়া জেলা বিএনপির উদ্যোগে সদ্যপ্রয়াত দলীয় চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার রুহের মাগফিরাত কামনায় আয়োজিত গণদোয়া মাহফিলে অংশ নেবেন। পাশাপাশি রংপুরে জুলাই আন্দোলনের শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারত করবেন। আসন্ন নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের পাশাপাশি বগুড়া-৬ (সদর) আসন থেকেও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে থাকছেন তারেক রহমান।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আসন সমঝোতার ভিত্তিতে বিএনপির সমর্থনে যারা নিজ নিজ দলের প্রতীকে নির্বাচন করছেন, মূলত তাদের নেতারাই তারেক রহমানের সঙ্গে বেশি সাক্ষাৎ করছেন। তারা বিএনপির ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতে যেন দলের কোনো নেতা মাঠে না থাকেন, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাচ্ছেন জোট শরিকরা।
এদিকে মনোনয়ন না পেয়ে অর্ধশতাধিক আসনে ‘অভিমানী নেতা’ হিসেবে পরিচিত বিএনপির কয়েকজন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় বিষয়টি দলের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ধানের শীষ ও জোট প্রার্থীদের বিজয় নিশ্চিত করতে এসব প্রার্থীকে নির্বাচন থেকে সরিয়ে আনতে দ্রুত তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে পারেন তারেক রহমান।
নির্বাচনী প্রচারেও সক্রিয়ভাবে নামবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এ লক্ষ্যে দলের পক্ষ থেকে কর্মসূচি চূড়ান্ত করা হচ্ছে। বিভাগীয় পর্যায়ে জনসভা ছাড়াও ঢাকার একাধিক আসনে ধানের শীষের প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারে অংশ নেবেন তিনি। পাশাপাশি ঢাকা-১২সহ জোট শরিকদের জন্য ছেড়ে দেওয়া আসনগুলোতেও যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তপশিল অনুযায়ী আগামী ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দের পর আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচার শুরু হবে। জানা গেছে, প্রয়াত মায়ের মতো সিলেটে দুই সুফি সাধকের মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী কার্যক্রমের সূচনা করবেন তারেক রহমান।
গুলশানে রাজনৈতিক কার্যালয়ে সাক্ষাতের ধারাবাহিকতায় গতকাল সোমবারও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন তারেক রহমান। সকালে বাম দলগুলোর জোট ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’-এর নেতাদের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে তিনি বলেন, ‘একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে বাদ দিলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব থাকে না।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বাসী, অবিশ্বাসী ও সংশয়বাদী—সবাইকে নিয়ে একটি উদার গণতান্ত্রিক কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে তার।
বৈঠক শেষে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ সাংবাদিকদের জানান, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে সমবেদনা জানাতেই মূলত যুক্তফ্রন্টের নেতারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে সিপিবি, বাসদ, জাসদসহ বিভিন্ন বাম ও প্রগতিশীল দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির পক্ষ থেকে মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বৈঠকে অংশ নেন।
বজলুর রশিদ ফিরোজ জানান, তারেক রহমান পুনর্ব্যক্ত করেছেন যে, মুক্তিযুদ্ধই বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ভিত্তি। ’৯০-এর গণঅভ্যুত্থান ও সাম্প্রতিক গণআন্দোলনের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করেই সামনে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, মতপার্থক্য থাকলেও জাতীয় স্বার্থে পরস্পরের সঙ্গে আলোচনা ও সহযোগিতার দরজা খোলা থাকবে।
এ ছাড়া নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন, জমিয়ত, এবি পার্টি ও বাংলাদেশ লেবার পার্টিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারাও পৃথকভাবে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে খালেদা জিয়ার প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং শোক বইয়ে স্বাক্ষর করেন।
খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের পক্ষ থেকে পাঠানো শোকবার্তাও তারেক রহমানের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার একান্ত সচিব সজীব এম খায়রুল ইসলাম গুলশানে গিয়ে শোকবার্তাটি হস্তান্তর করেন।
এর আগে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও শিল্পোদ্যোক্তারা তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ব্যবসা-বাণিজ্যের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ তুলে ধরেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কথা শুনে তারেক রহমান আশ্বাস দেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন নির্বাচনে বিএনপির ক্ষমতায় আসার সম্ভাবনা থাকায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী মহল তারেক রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী। দীর্ঘদিন পর দেশে ফিরে তিনি এখন নির্বাচনী রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছেন, যা তাকে জাতীয় রাজনীতিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে।



