কুড়িগ্রাম সদর খাদ্য গুদামে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ও সংগ্রহের নথিতে অনিয়মের মাধ্যমে ২ কোটি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫২ টাকার খাদ্যশস্য আত্মসাতের অভিযোগে চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। একই গুদামে বৈধ নথিপত্র ছাড়াই ১১৯ মেট্রিক টন চাল মজুদেরও সন্ধান পেয়েছে সংস্থাটি। ওই চালের মূল্য প্রায় ৬৯ লাখ ৪০ হাজার টাকা।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকতারুল ইসলাম মামলার বিষয়টি জানান।
মামলার আসামিরা হলেন কুড়িগ্রাম সদর খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরীফ আহমেদ, সহকারী উপখাদ্য পরিদর্শক মো. হেলাল উদ্দিন, সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. হালিমুর রহমান এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ হামিদুল হক।
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, আসামিরা পরস্পরের যোগসাজশে সরকারি খাদ্যশস্যের মজুদ ও সংগ্রহসংক্রান্ত রেকর্ডে অসংগতি তৈরি করেন। এসব অনিয়মের মাধ্যমে তারা ২ কোটি ১ লাখ ৭৫ হাজার ৩৫২ টাকার খাদ্যশস্য আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া শরীফ আহমেদের দায়িত্ব পালনকালে বৈধ নথি ছাড়াই ১১৯ মেট্রিক টন চাল মজুদের তথ্য পাওয়া গেছে।
দুদকের কুড়িগ্রাম সমন্বিত জেলা কার্যালয়ের এনফোর্সমেন্ট টিম গত ১১ জানুয়ারি সদর খাদ্য গুদামে অভিযান চালায়। এ সময় শিশু নিকেতন ও খলিলগঞ্জ ব্লকের গুদাম পরিদর্শন করে নথিতে উল্লেখ করা মজুদের সঙ্গে বাস্তব মজুদের পার্থক্য শনাক্ত করা হয়। এজাহার অনুযায়ী, দুই ব্লকের বিভিন্ন খামালে ১ হাজার ১৭৬ বস্তা চাল কম পাওয়া যায়। এসব চালের পরিমাণ ৪২ দশমিক ২০৫ মেট্রিক টন, যার মূল্য ২৪ লাখ ৬১ হাজার টাকার বেশি।
গুদামের নথিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৭১১ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের হিসাব থাকলেও এর বড় অংশের বাস্তব মজুদ কিংবা সংগ্রহের পক্ষে প্রয়োজনীয় প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, ওই ধানের মধ্যে ২৪০ মেট্রিক টনের বিল পরিশোধের তথ্য রয়েছে। এর মধ্যে ১৯০ মেট্রিক টন ধান গুদামে মজুদ ছিল বলে জানা যায়।
বাকি ৫০ মেট্রিক টন ধান ছাঁটাইয়ের জন্য মেসার্স এলাহী অটো রাইস মিলে পাঠানো হয়েছে বলে দাবি করেন গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। তবে তদন্ত কমিটি সরেজমিনে মিলটি পরিদর্শন করলে এর মালিক মো. মুকুল সরকার জানান, সেখানে কোনো ধান পাঠানো হয়নি। এ ছাড়া ধান ছাঁটাইয়ের প্রেরণ ফরমের তারিখের সঙ্গে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বক্তব্যেরও অসংগতি পাওয়া যায়। অনুপস্থিত ওই ৫০ মেট্রিক টন ধানের মূল্য ১৭ লাখ টাকা।
এ ছাড়া নথিতে থাকা আরও ৪৭১ মেট্রিক টন ধানের বাস্তব মজুদ বা সংগ্রহের পক্ষে গ্রহণযোগ্য তথ্য মেলেনি। প্রতি মেট্রিক টন ধানের দাম ৩৪ হাজার টাকা ধরে এর মোট মূল্য দাঁড়ায় ১ কোটি ৬০ লাখ ১৪ হাজার টাকা।
অভিযানের সময় শিশু নিকেতন ব্লকের এফএস-৩ নম্বর গুদামের পশ্চিম গেটসংলগ্ন এলাকায় রেকর্ডের বাইরে ১১৯ মেট্রিক টন চালের একটি খামাল পাওয়া যায়। এসব চালের সংগ্রহ রেজিস্টার, ওজন ও মানসংক্রান্ত সনদ, চালান এবং গুদাম লেজারসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখাতে পারেননি ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
পরে ১২ জানুয়ারি জব্দতালিকা তৈরি করে চালগুলো জব্দ করা হয় এবং জিম্মায় দেওয়া হয়। প্রতি মেট্রিক টন চালের মূল্য ৫৮ হাজার ৩১৮ টাকা ৯৮ পয়সা হিসাবে এর মোট বাজারমূল্য ৬৯ লাখ ৩৯ হাজার ৯৫৯ টাকা।
দুদক জানিয়েছে, সরকারি খাদ্যশস্য আত্মসাতের অভিযোগে দণ্ডবিধির ৪২০, ৪০৯ ও ১০৯ ধারা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারায় চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে, রেকর্ডবহির্ভূত চাল মজুদের ঘটনায় শরীফ আহমেদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ১২০(খ) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তদন্তে অন্য কারও সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে তাঁদের বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।



