হার্ট অ্যাটাক হঠাৎ করেই ঘটতে পারে। তবে অনেকের ক্ষেত্রে এর আগে শরীরে কিছু সতর্কসংকেত দেখা দিতে পারে। বুকে অস্বস্তি, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, শ্বাসকষ্ট কিংবা বুক ধড়ফড় করার মতো লক্ষণকে তাই অবহেলা করা উচিত নয়।
তবে এসব লক্ষণ দেখা দিলেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে, এমন নয়। অন্যান্য অনেক শারীরিক সমস্যার কারণেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই লক্ষণগুলো নতুন, তীব্র বা অস্বাভাবিক হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
১. বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি
হার্ট অ্যাটাকের সবচেয়ে পরিচিত লক্ষণগুলোর একটি হলো বুকে ব্যথা বা অস্বস্তি। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় হার্ট অ্যাটাকের আগে পূর্বলক্ষণ দেখা দেওয়া রোগীদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বুকে ব্যথার কথা জানিয়েছিলেন।
বুকে চাপ, ভারী ভাব, আঁটসাঁট অনুভূতি বা অস্বস্তিও এর সঙ্গে থাকতে পারে।
২. বুকে ভারী বা চাপ অনুভূত হওয়া
বুকে ভারী ভাব, চাপ বা আঁটসাঁট অনুভূতিও হার্টের সমস্যার সতর্কসংকেত হতে পারে। বিশেষ করে শারীরিক পরিশ্রমের সময় এ ধরনের অস্বস্তি দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন।
৩. বুক ধড়ফড় করা
হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত বা জোরে অনুভূত হওয়া, কিংবা হৃদস্পন্দন মাঝে মাঝে বাদ যাচ্ছে বলে মনে হওয়াকে বুক ধড়ফড় করা বলা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
৪. শ্বাসকষ্ট
হাঁটা, সিঁড়ি ভাঙা বা অন্য কোনো শারীরিক কাজের সময় অস্বাভাবিক শ্বাসকষ্ট হতে পারে। কখনো কখনো বিশ্রামের সময়ও শ্বাস নিতে কষ্ট হতে পারে। মনে হতে পারে, ফুসফুস পর্যাপ্ত বাতাস পাচ্ছে না।
৫. বুকে জ্বালাপোড়া
হার্টের সমস্যাজনিত অস্বস্তি অনেক সময় গ্যাস্ট্রিক বা হার্টবার্নের মতো মনে হতে পারে। তাই বারবার বুকে জ্বালাপোড়া বা অস্বস্তি হলে শুধু গ্যাস্ট্রিক ভেবে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়।
৬. অস্বাভাবিক ক্লান্তি
পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরও অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভূত হলে তা গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। বিশেষ করে কোনো স্পষ্ট কারণ ছাড়াই দীর্ঘদিন ধরে এমন ক্লান্তি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
৭. মাথা ঘোরা বা হালকা লাগা
হৃদ্যন্ত্র পর্যাপ্ত রক্ত পাম্প করতে না পারলে মাথা ঘোরা বা দুর্বল লাগার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। নতুন করে এমন সমস্যা শুরু হলে এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো হৃদ্যন্ত্রের উপসর্গ থাকলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
৮. বমি ভাব বা বমি
বমি ভাব, বমি বা পেটে অস্বস্তিও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হার্ট অ্যাটাকের সঙ্গে দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে এর সঙ্গে বুকে অস্বস্তি, ঘাম বা শ্বাসকষ্ট থাকলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
৯. অস্বাভাবিক উদ্বেগ
হঠাৎ অস্বাভাবিক উদ্বেগ, অস্থিরতা বা ভয় লাগার অনুভূতিও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে হার্টের সমস্যার সঙ্গে দেখা দিতে পারে। তবে উদ্বেগের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে। তাই শুধু এই একটি লক্ষণের ভিত্তিতে হার্ট অ্যাটাকের সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
১০. ঘুমের ব্যাঘাত
অকারণে নিয়মিত ঘুমের সমস্যা হওয়া কখনো কখনো শারীরিক সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের সমস্যায় শুয়ে থাকার সময় শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটতে পারে।
১১. পা বা গোড়ালি ফুলে যাওয়া
পা, গোড়ালি বা পায়ের পাতায় অস্বাভাবিক ফোলাভাব কিছু ক্ষেত্রে হৃদ্যন্ত্রের সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে। হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা কমে গেলে শরীরে তরল জমে এ ধরনের ফোলাভাব দেখা দিতে পারে।
১২. বুক ছাড়াও শরীরের অন্য অংশে ব্যথা
হার্ট অ্যাটাকের ব্যথা সবসময় শুধু বুকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। ব্যথা বা অস্বস্তি হাত, কাঁধ, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারও ক্ষেত্রে এসব উপসর্গ বুকের ব্যথার পাশাপাশি দেখা দিতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের আগে কেন এসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে?
হার্টে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ কমে গেলে শরীরে বিভিন্ন ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। করোনারি ধমনির দেয়ালে চর্বি, কোলেস্টেরল, ক্যালসিয়াম ও অন্যান্য পদার্থ জমে প্লাক তৈরি হতে পারে। কোনো ক্ষেত্রে এই প্লাক ক্ষতিগ্রস্ত বা ফেটে গিয়ে রক্ত জমাট তৈরি করলে ধমনিতে রক্তপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে হৃদ্পেশিতে পর্যাপ্ত রক্ত ও অক্সিজেন না পৌঁছালে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
হার্ট অ্যাটাকের ঠিক আগে যে লক্ষণগুলো দেখা দিতে পারে
হার্ট অ্যাটাকের উপসর্গ ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণ কিছু লক্ষণ হলো—
-
বুকের মাঝখানে বা বাম পাশে ব্যথা, চাপ বা অস্বস্তি, যা কয়েক মিনিট স্থায়ী হতে পারে বা কমে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারে।
-
শ্বাসকষ্ট।
-
অতিরিক্ত ঘাম।
-
মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অনুভূতি।
-
পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা বা অস্বস্তি।
-
এক বা দুই হাত কিংবা কাঁধে ব্যথা বা অস্বস্তি।
-
বমি ভাব বা বমি।
কখন জরুরি চিকিৎসা নেবেন?
বুকে চাপ বা ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, ঠান্ডা ঘাম, মাথা ঘোরা, বমি ভাব কিংবা হাত, পিঠ, ঘাড় বা চোয়ালে ব্যথা থাকলে অপেক্ষা না করে জরুরি চিকিৎসা নিন। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মনে রাখতে হবে, হার্ট অ্যাটাকের সব রোগীর একই ধরনের লক্ষণ থাকে না। কারও উপসর্গ খুব স্পষ্ট হতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে তুলনামূলক মৃদু লক্ষণ দেখা দিতে পারে। তাই নতুন বা অস্বাভাবিক উপসর্গকে অবহেলা না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।



