সৌদি আরবে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার খবর পাওয়া গেছে। সোমবার (১২ অক্টোবর) নতুন করে হামলার মুখে পড়ার কথা জানিয়েছে দেশটি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। এর আগে গত শনিবার বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনালে প্রাণঘাতী ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটে। ওই হামলার দায় স্বীকার করে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। খবর রয়টার্সের।
ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দেওয়া সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সোমবার নতুন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন আসার খবর জানায়। তবে এসব হামলা প্রতিহত করা সম্ভব হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
গত সপ্তাহ থেকে সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা চালাচ্ছে হুথিরা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের জেরে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ার মধ্যে এসব হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে সৌদি আরবের আকাশসীমার কিছু অংশে বিমান চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে স্থগিত করা হয়েছে রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম। এতে রাজধানীর আকাশপথে বিমান চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই রিয়াদে অনুষ্ঠিত হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সম্মেলন।
বাব আল-মান্দেব প্রণালি ঘিরে নতুন করে সংঘাতের আশঙ্কা
সৌদি আরব এখন এক জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতির মুখোমুখি। গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পথ নিরাপদ রাখা এবং সাম্প্রতিক অগ্রগতির পর হুথিদের সামরিক শক্তি আরও বেড়ে যাওয়া ঠেকাতে দেশটি আবারও ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ছে।
ইয়েমেনের সামরিক সূত্রগুলোর বরাত দিয়ে জানা গেছে, বাব আল-মান্দেব প্রণালির আশপাশে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি বাহিনী কিছুটা অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে অন্য কয়েকটি রণাঙ্গনে এখনও চাপের মুখে রয়েছে তারা। ফলে হুথিদের ওপর সামরিক চাপ বাড়ানো হলেও এর প্রত্যাশিত ফল পেতে সময় লাগতে পারে।
এদিকে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সৌদি সরকারের বিরোধ নিরসনে মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়েছে। সোমবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সংলাপ সহজ করতে তেহরান বারবার সহযোগিতার প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে।
অন্যদিকে, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলা আরও জোরদার হয়েছে। ইয়েমেনের একটি টেলিভিশন চ্যানেলের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার দেশটির আল-জাওফ প্রদেশেও হামলা চালানো হয়েছে। তবে সৌদি আরবের পাল্টা হামলা সত্ত্বেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে আক্রমণ বন্ধের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি হুথিরা।
গোষ্ঠীটি একাধিকবার সৌদি আরবের বিমানবন্দর, আকাশসীমা ও তেল স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করার হুমকি দিয়েছে। এসব স্থাপনা দেশটির অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। একই সঙ্গে সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নেও জ্বালানি খাত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
উপসাগরীয় দেশগুলোর যৌথ নিরাপত্তা জোরদারের আহ্বান আমিরাতের
সোমবার রিয়াদে অনুষ্ঠিত জ্বালানি সম্মেলনে সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়নের বৃহত্তর লক্ষ্য অর্জনে বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে তাঁর দেশ।
তিনি জানান, সৌদি আরবের জ্বালানি ব্যবস্থা ও শিল্প সক্ষমতা উন্নয়নের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
এদিকে সৌদি আরবের প্রতিবেশী সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছে।
সোমবার আমিরাতের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আনোয়ার গারগাশ বলেন, সৌদি আরবকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হলে তা উপসাগরীয় অঞ্চলের সব দেশের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে। সম্মিলিত উপসাগরীয় নিরাপত্তার বিষয়টি উপেক্ষা করার কারণে অন্য পক্ষগুলো আঞ্চলিক দেশগুলোর বিরুদ্ধে বাড়াবাড়ি করার সাহস পেয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত দীর্ঘদিন ধরে ইয়েমেন সংঘাতে অংশীদার হিসেবে কাজ করেছে। তবে ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থন দেওয়া সামরিক জোটের মধ্যে দুই দেশ বিভিন্ন পক্ষ ও বাহিনীকে সমর্থন দিয়েছে। এ নিয়ে গত শীতকালে দেশ দুটির মধ্যে মতবিরোধও দেখা দেয়।
হুথিদের বিরুদ্ধে যৌথ হামলার কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র
এদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত শনিবার বলেছেন, হুথি বিদ্রোহীদের লক্ষ্য করে সৌদি আরবের সঙ্গে যৌথ সামরিক হামলায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে ওয়াশিংটন।
তবে এখন পর্যন্ত হুথিদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের বিমানবন্দর ও জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে ধারাবাহিক হামলা, ইয়েমেনে পাল্টাপাল্টি সামরিক অভিযান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।



