সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়। গর্ভধারণের পর নয়, বরং তার কয়েক মাস আগে থেকেই নিজের স্বাস্থ্য ও জীবনযাপনের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন। এতে গর্ভধারণের প্রস্তুতি যেমন ভালোভাবে নেওয়া যায়, তেমনি মা ও অনাগত সন্তানের সুস্থতার জন্যও উপকার পাওয়া সম্ভব।
যুক্তরাজ্যের কেমব্রিজের চিকিৎসক ও সহায় হেলথের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ডা. তাসনিম জারা এক ভিডিওতে সন্তান নেওয়ার আগে করণীয় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন।
১. ফলিক অ্যাসিড শুরু করুন
গর্ভধারণের অন্তত এক মাস আগে থেকেই ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। শরীরে এর ঘাটতি থাকলে শিশুর মস্তিষ্ক ও মেরুদণ্ডের বিকাশে জন্মগত ত্রুটির ঝুঁকি বাড়তে পারে। সাধারণভাবে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে প্রতিদিন ৪০০ মাইক্রোগ্রাম ফলিক অ্যাসিড গ্রহণ এবং গর্ভধারণের পর ১২ সপ্তাহ পর্যন্ত তা চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ রয়েছে। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজন ভিন্ন হতে পারে, তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
২. প্রয়োজনীয় টিকা সম্পন্ন করুন
কোনো গুরুত্বপূর্ণ টিকা বাকি থাকলে গর্ভধারণের আগে তা সম্পন্ন করে নেওয়া উচিত। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-এর মতো সংক্রমণ প্রতিরোধে টিকার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ছোটবেলায় প্রয়োজনীয় টিকা না নেওয়া হয়ে থাকলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী করণীয় ঠিক করতে হবে।
৩. আয়রনের ঘাটতি আছে কি না দেখুন
নারীদের মধ্যে আয়রনের ঘাটতিজনিত রক্তস্বল্পতা বেশ সাধারণ। গর্ভাবস্থায় এই সমস্যা থাকলে মা ও শিশুর ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে আগে থেকেই রক্তস্বল্পতা বা আয়রনের ঘাটতি রয়েছে কি না পরীক্ষা করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
৪. ভিটামিন ডি-এর দিকে খেয়াল রাখুন
হাড়, দাঁত ও পেশির সুস্থতার পাশাপাশি শিশুর স্বাভাবিক বিকাশেও ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে এটির ঘাটতি রয়েছে কি না তা প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করা যেতে পারে। পর্যাপ্ত সূর্যালোক না পাওয়া কিংবা শরীর পুরোপুরি ঢেকে রাখার অভ্যাসের কারণেও কারও কারও ভিটামিন ডি কমে যেতে পারে।
৫. ক্যাফেইন কমিয়ে আনুন
অতিরিক্ত ক্যাফেইন গর্ভাবস্থায় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। উচ্চমাত্রায় ক্যাফেইন গ্রহণের সঙ্গে কম ওজনের শিশু জন্ম ও গর্ভপাতের মতো জটিলতার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। চিকিৎসকদের প্রচলিত পরামর্শ অনুযায়ী, গর্ভাবস্থায় দৈনিক ক্যাফেইন ২০০ মিলিগ্রামের মধ্যে রাখা ভালো। নিয়মিত বেশি ক্যাফেইন গ্রহণের অভ্যাস থাকলে গর্ভধারণের পরিকল্পনা থেকেই ধীরে ধীরে তা কমানো সহজ হতে পারে।
৬. ওজন স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করুন
অতিরিক্ত ওজন থাকলে গর্ভাবস্থায় ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন জটিলতার ঝুঁকি বাড়তে পারে। আবার ওজন খুব কম হলেও গর্ভধারণ ও প্রসবের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই সন্তান নেওয়ার আগে স্বাস্থ্যকর ওজন বজায় রাখার দিকে নজর দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে গর্ভাবস্থায় নিজের মতো করে ওজন কমানোর চেষ্টা করা উচিত নয়।
৭. খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনুন
গর্ভধারণের পরিকল্পনার সময় থেকেই পুষ্টিকর খাবারকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। খাবারের তালিকায় পর্যাপ্ত শাকসবজি, আমিষ ও স্বাস্থ্যকর শর্করা রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। অতিরিক্ত লবণ, চিনি, তেল ও ফাস্টফুডের পরিমাণ কমিয়ে সুষম খাবারে অভ্যস্ত হওয়া ভালো।
৮. ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর প্রস্তুত করুন
গর্ভধারণ ও সন্তান জন্মদানের পুরো প্রক্রিয়াটি শরীরের ওপর যথেষ্ট চাপ তৈরি করে। তাই আগে থেকেই নিয়মিত ও উপযোগী শারীরিক ব্যায়ামের অভ্যাস গড়ে তোলা শরীরকে প্রস্তুত রাখতে সহায়ক হতে পারে। ব্যায়ামের ধরন ও মাত্রা ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত।
৯. ধূমপান থেকে দূরে থাকুন
ধূমপান নারী ও পুরুষ উভয়ের প্রজননক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শুধু নিজে ধূমপান করাই নয়, পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শও ক্ষতিকর হতে পারে। তাই সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা করলে পরিবারের সদস্যদেরও ধূমপানমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়ে সচেতন হওয়া প্রয়োজন।
১০. আগে থেকেই রোগ নিয়ন্ত্রণে রাখুন
ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, খিঁচুনিসহ কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা থাকলে গর্ভধারণের আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনা জরুরি। এজন্য সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্তের পর চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও চিকিৎসা পরিকল্পনা করা উচিত।
সন্তান নেওয়ার প্রস্তুতি শুধু গর্ভধারণের সময় থেকে শুরু হয় না। আগে থেকেই পুষ্টি, ওজন, ব্যায়াম, টিকা এবং বিদ্যমান রোগের বিষয়ে সচেতন হলে মা ও শিশুর জন্য একটি সুস্থ গর্ভাবস্থার ভিত্তি তৈরি করা সহজ হয়।



