রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কোনোভাবেই থামছে না ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। প্রকাশ্যে ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাই, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গুলি ও হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটছে একের পর এক। অপরাধীদের ধরতে বিশেষ অভিযান, ব্লক রেইড ও টহল জোরদার করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। স্থানীয়দের সঙ্গে মতবিনিময়ের পাশাপাশি গ্রেপ্তার করা হচ্ছে সন্দেহভাজন অপরাধীদেরও। তবু থামছে না অপরাধপ্রবণ চক্রগুলোর তৎপরতা। দিনদুপুরে ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে আবাসিক এলাকার অলিগলি—কোথাও যেন নিরাপদ নন সাধারণ মানুষ।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আগে মোহাম্মদপুরের বসিলা, ৪০ ফিট, চন্দ্রিমা হাউজিং, চানমিয়া হাউজিং, ঢাকা উদ্যান ও বেড়িবাঁধসহ আশপাশের এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা বেশি ঘটত। এখন সেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে সলিমুল্লাহ রোড, কলেজগেট, আসাদগেট, রায়েরবাজার, বুদ্ধিজীবী রোড ও নূরজাহান রোডসহ বিভিন্ন আবাসিক এলাকায়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দিনের আলো কিংবা রাতের অন্ধকার—যেকোনো সময় অস্ত্রের মুখে সর্বস্ব হারানোর আশঙ্কা নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে বাসিন্দাদের। এমনকি নিজের বাসার সামনেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন অনেকে।
দিনের আলোয় অস্ত্রের মুখে ছিনতাই
গত ২১ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ৩টার দিকে মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডের অনুপম গলিতে এক তরুণ-তরুণী হেঁটে যাচ্ছিলেন। এ সময় একটি অটোরিকশা থেকে নেমে সামুরাই হাতে দুজন ছিনতাইকারী তাদের পথরোধ করে। কিছুক্ষণের মধ্যে চাপাতি হাতে আরও দুজন তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাদের মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। ফোন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তরুণীকে কোপানোর হুমকিও দেওয়া হয়।
একপর্যায়ে ধস্তাধস্তিতে ওই তরুণ-তরুণী দুজনই রাস্তায় পড়ে যান। স্থানীয়রা ছিনতাইকারীদের ধাওয়া করলেও অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে অটোরিকশায় করে পালিয়ে যায় তারা। ব্যস্ত সড়কে দিনের বেলায় এমন ঘটনায় এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
শুধু ২১ অক্টোবর নয়, পরদিন ভোরেও একই এলাকায় ধারালো অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এর আগে ১৩ অক্টোবর সলিমুল্লাহ রোডে এক যুবকের গলায় সামুরাই ঠেকিয়ে তার আইফোন ছিনিয়ে নেয় চার ছিনতাইকারী। ফোন নেওয়ার পর সেটির লক খুলে দিতেও বাধ্য করে তারা। গত এক সপ্তাহে ওই এলাকায় অন্তত পাঁচটি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৮ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৮ মিনিটে রায়েরবাজারের শহীদ বুদ্ধিজীবী রোডে এক মাদ্রাসাশিক্ষককে সামুরাই দিয়ে আঘাত করে মোবাইল ফোন ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এর আগে ১২ অক্টোবর রাতে নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে ফেরার পথে এক ব্যবসায়ীর অটোরিকশার গতিরোধ করে হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। সামুরাই দিয়ে আঘাত করার পর তার মোবাইল ফোন, স্বর্ণের ব্রেসলেটসহ প্রায় সাড়ে চার লাখ টাকার মালামাল ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
চাঁদার বিরোধে বাবা গুলিবিদ্ধ, ছেলেকে কোপানোর অভিযোগ
ছিনতাইয়ের পাশাপাশি মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজি ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেও সহিংসতার ঘটনা ঘটছে। গত ১৫ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টার দিকে মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ডের অদূরে ময়ূরভিলার সামনে প্রকাশ্যে গুলি ও ধারালো অস্ত্র দিয়ে হামলার ঘটনা ঘটে। এতে মো. সুমন নামে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হন এবং তার ছেলে ফাহিমকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করা হয়।
সুমন ও ফাহিম ভ্যানে করে ফুটপাতে আলু-পেঁয়াজ বিক্রি করেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় তারা প্রতিদিনের মতো ময়ূরভিলার সামনে ব্যবসা করছিলেন। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ছয় থেকে সাতজন দুর্বৃত্ত এসে সুমনের পায়ে গুলি করে। পরে তার ছেলে ফাহিমকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে আহত করা হয়।
আশপাশের ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ফুটপাতে ব্যবসা করতে একটি পক্ষকে নির্দিষ্ট পরিমাণ চাঁদা দিতে হয়। সম্প্রতি সেই চাঁদার পরিমাণ বাড়ানোর জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছিল। বাড়তি টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় বিরোধের সূত্রপাত হয় বলে দাবি তাদের।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফাহিম অভিযোগ করেন, হামলাকারীরা সাজ্জাদ গ্রুপের সদস্য। ছয়জনের মধ্যে মুন্না (২৬), রাব্বি (২৬) ও মনির হোসেন নামে কয়েকজনকে তিনি চিনতে পেরেছেন। গত মাসে একই চক্র তার ফরহাদ নামের এক মামাকেও হত্যা করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
আড়াই কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ
একই দিন মোহাম্মদপুরের নবীনগর হাউজিংয়ের ৬০ ও ৬২ নম্বর প্লটে আড়াই কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগে নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেওয়ার ঘটনা ঘটে। চাঁদা না দিলে প্লট ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মাইমুনা কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মো. কাউসার রহমান।
এ ঘটনায় চাঁদা দাবি, মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানায় লিখিত অভিযোগ করেন কাউসার। অভিযোগে মো. ইমরান কাজল, মো. সামসুদ্দোহা, মো. আজানুর রহমান ও মো. তানভীরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি অজ্ঞাতনামা ২৫ থেকে ৩০ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
কাউসারের দাবি, অভিযুক্ত ইমরান কাজল এ ঘটনার মূলহোতা। গত ৩ অক্টোবর নির্মাণকাজ শুরু করতে গেলে প্রতিপক্ষের লোকজন তা বন্ধ করে দেন। কাজ বন্ধের কারণ জানতে চাইলে আড়াই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। মালিকপক্ষ চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে প্রকল্পের বিভিন্ন সরঞ্জাম ও মালামাল ভাঙচুর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মোটরসাইকেল ছিনতাই থেকে জমি দখলের চেষ্টা
গত ১৭ সেপ্টেম্বর সকাল পৌনে ৮টার দিকে মোহাম্মদপুরের সাদেক খান রোডে হৃদয় মিয়া (২৫) নামে এক মুদি ব্যবসায়ীকে কুপিয়ে মোটরসাইকেল ও নগদ টাকা ছিনিয়ে নেওয়া হয়।
হৃদয়ের বন্ধু মো. বিপ্লব জানান, হৃদয়ের বাসা হাজারীবাগের গণকটুলী এলাকায়। ধানমণ্ডিতে তার মুদির ব্যবসা রয়েছে। ঘটনার দিন সকালে তিনি মোটরসাইকেল চালিয়ে মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে মালামাল আনতে যাচ্ছিলেন। পথে সাদেক খান রোডে পৌঁছালে চার থেকে পাঁচজন ছিনতাইকারী তার মোটরসাইকেলের গতিরোধ করে। পরে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে মোটরসাইকেল ও সঙ্গে থাকা ২০ হাজার টাকা নিয়ে পালিয়ে যায় তারা।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর দিনদুপুরে মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধ রোডের বিট পুলিশিং অফিসের সামনে শতাধিক লোক নিয়ে ৩৫ কাঠা জমি দখলের চেষ্টা, হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ ওঠে।
সর্বশেষ গত ২৫ অক্টোবর মোটরসাইকেল কেনার কথা বলে এক ব্যবসায়ীকে বাসায় ডেকে নিয়ে মারধর ও অপহরণ করে ১০ লাখ টাকা আদায়ের চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ঘটনায় একটি গোয়েন্দা সংস্থার দুই সদস্য, আনসারের এক সদস্য ও একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তাপ্রহরীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের বিরুদ্ধে করা মামলায় আরও দুজনকে আসামি করা হয়েছে।
অভিযান চলছে, গ্রেপ্তারও হচ্ছে
মোহাম্মদপুরে অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত ২৫ অক্টোবর রাতে চাঁদাবাজির অভিযোগে মোহাম্মদপুর থানার ৩৪ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মাসুম খান রাজেশকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।
এর আগে ২২ অক্টোবর দিবাগত রাতে ১ নম্বর বুদ্ধিজীবী রোডের মিনা হাউজ গলি থেকে সামুরাইসহ মো. মিঠু মিয়া (১৯) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশের কাছে মিঠু দাবি করেন, ১২ অক্টোবর রায়েরবাজার কমিউনিটি সেন্টারের সামনে থেকে তিনি, পলাশ, লাল ও তোতা মিলে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৯ হাজার টাকা ও দুটি ফোন ছিনিয়ে নেন। এর আগে হোসেন সাহেবের গলি থেকে এক যুবকের চার লাখ টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সঙ্গেও তারা জড়িত ছিলেন বলে তার ভাষ্য।
একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মোহাম্মদপুর ফিউচার মডেল টাউনের ৫ নম্বর সড়কে আলমের গ্যারেজের পাশ থেকে ফিরোজ ওরফে কেন্তা ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। রাত সাড়ে ৯টার দিকে বোটঘাট এলাকা থেকে ‘মুখে ল’ গ্রুপের সক্রিয় সদস্য বলে পরিচিত মো. দিদারকে (২৭) গ্রেপ্তার করা হয়।
গত ১৩ অক্টোবর মোহাম্মদপুরে বিশেষ ব্লক রেইড চালিয়ে ৫৯ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ, ডিবি, সোয়াট, স্পেশাল রেসপন্স ব্রাঞ্চ (এসআরবি), আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ও ডগ স্কোয়াডের সদস্যরা। এর আগের দিন অভিযান চালিয়ে নারী, পুরুষ ও কিশোরসহ ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তাদের কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত তিনটি সুইচ গিয়ার ছুরি, দুটি ধারালো ছুরি, চারটি লোহার রড ও একটি করাত কাটার ছুরি উদ্ধার করা হয়।
এ ছাড়া গত ২৪ অক্টোবর ছিনতাইয়ের প্রস্তুতিকালে কলেজগেট এলাকা থেকে মো. হাসনাইন (২৬) নামে এক যুবককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি সুইচ গিয়ার উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ বলছে, অভিযান ও টহল জোরদার
মোহাম্মদপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল হালিম বলেন, অপরাধী চক্রের সদস্যরা পথচারী, বাসযাত্রী, রিকশার আরোহী এবং হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনদের লক্ষ্য করে ছিনতাই করত। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে কিংবা নারীদের অসাবধানতার সুযোগ নিয়ে ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন, টাকা-পয়সাসহ মূল্যবান জিনিসপত্র ছিনিয়ে নিত তারা। ছিনতাই প্রতিরোধে পুলিশের অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. ইবনে মিজান বলেন, মোহাম্মদপুরে চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য কমানো, অপরাধ দমন এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অভিযান চলছে। কিশোর গ্যাং, চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারীরা যাতে আবার সক্রিয় হয়ে উঠতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত অভিযান ও টহল জোরদার করা হয়েছে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্রাঞ্চের (এসআরবি) সদর দপ্তরের উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী বলেন, মোহাম্মদপুরে এসআরবির সদস্য ও অভিযানে নিয়োজিত কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন ছোট-বড় অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। সব বাহিনীর সহযোগিতায় শিগগিরই এলাকা থেকে অপরাধ নির্মূল করা সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অন্যদিকে, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ ঘোষণা দিয়েছেন, মোহাম্মদপুরে কিশোর গ্যাংয়ের কোনো অস্তিত্ব থাকতে দেওয়া হবে না। তার ভাষ্য, এলাকায় ‘কিশোর গ্যাং’ বলে কোনো শব্দ থাকবে না।
তবে ধারাবাহিক অভিযান, গ্রেপ্তার ও টহল জোরদারের পরও একের পর এক ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও সহিংসতার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। অপরাধীদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি এসব চক্রের পৃষ্ঠপোষকতা বন্ধ, চাঁদাবাজি প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করাই এখন মোহাম্মদপুরবাসীর প্রধান প্রত্যাশা।



