২০২৭ শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে বাকি মাত্র দুই মাস। এরই মধ্যে পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীক ব্যবহারের বিতর্কে নতুন করে জটিলতায় পড়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বিতরণ করা প্রায় ২০ লাখ পাঠ্যবই ফেরত এনে সংশোধনের পর পুনরায় বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বই সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণকে কেন্দ্র করে এনসিটিবিতে অস্থিরতা বিরাজ করছে। এরই মধ্যে সোমবার প্রতিষ্ঠানটির নয় কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে। এর আগের দিন বদলি করা হয় আরও এক কর্মকর্তাকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, পাঠ্যবই সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণের কারণে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১৭ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। বর্তমানে প্রতিটি পাঠ্যবই ছাপাতে খরচ হয় প্রায় ৫৭ টাকা। আগামী ৩০ নভেম্বরের মধ্যে সংশোধিত বই মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এনসিটিবি। নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে এই কার্যক্রম শেষ করাই এখন প্রতিষ্ঠানটির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
যে ছবি ঘিরে বিতর্ক
ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি) বইয়ের ‘উপাত্ত ও তথ্য’ অধ্যায়ে জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তর—উপাত্ত, তথ্য, জ্ঞান ও প্রজ্ঞা—ব্যাখ্যা করা হয়েছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল ‘দাঁড়িপাল্লা’র ছবি। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের সংস্করণে সেটির পরিবর্তে মানুষের মস্তিষ্কের ছবি দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বইয়ে আবারও পুরোনো নকশায় ফিরে আসে ‘দাঁড়িপাল্লা’র ছবি।
‘দাঁড়িপাল্লা’ একটি রাজনৈতিক দলের নিবন্ধিত নির্বাচনী প্রতীক হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রথমে সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠায় প্রতীক পরিবর্তনের উদ্যোগ নেয় এনসিটিবি। পরে সিদ্ধান্ত হয়, জ্ঞানের পিরামিডের চারটি স্তরের নাম ও বিবরণ থাকলেও কোনো প্রতীক বা আইকন রাখা হবে না।
এনসিটিবির সদস্য এ কে এম শওকত আলী খান জানান, চলতি বছরের বইয়ে চারটি স্তরের নাম থাকবে, তবে কোনো আইকন ব্যবহার করা হবে না। পরবর্তী সময়ে বিষয়গুলো আরও পরিমার্জন করা হবে বলেও জানান তিনি।
নৌকার ছবি নিয়েও বিতর্ক
শুধু ‘দাঁড়িপাল্লা’ নয়, প্রাথমিক স্তরের বাংলা, ইংরেজি ও বিজ্ঞান বইয়ে ‘নৌকা’র ছবি ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে মোট ৮২টি নৌকার ছবি রয়েছে। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির বইয়ে ৩৪টি, দ্বিতীয় শ্রেণিতে ২৩টি এবং তৃতীয় শ্রেণিতে ২৫টি ছবি ব্যবহার করা হয়েছে।
এসব ছবি নিয়েও আপত্তি উঠেছে। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নৌকার ছবিগুলো ২০২৫ ও ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের বইয়েও ছিল।
এনসিটিবির নয় কর্মকর্তা বদলি
পাঠ্যবইয়ের ছবি নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই সোমবার এনসিটিবির নয় কর্মকর্তাকে বিভিন্ন সরকারি কলেজে বদলি করা হয়েছে। বদলি হওয়া সবাই বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তা।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বদলি হওয়া কর্মকর্তাদের আগামী ২৯ অক্টোবরের মধ্যে বর্তমান কর্মস্থল থেকে অবমুক্ত হতে হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অবমুক্ত না হলে ওই দিন অপরাহ্নে তাঁরা তাৎক্ষণিকভাবে অবমুক্ত হয়েছেন বলে গণ্য হবেন।
এর আগে রোববার এনসিটিবির গবেষণা কর্মকর্তা মু. আব্দুল্লাহ আল জোবায়েরকে খাগড়াছড়ি সরকারি মহিলা কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রভাষক হিসেবে বদলি করা হয়। ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বই সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
বদলি নিয়ে প্রশ্ন
এদিকে প্রাথমিক স্তরের বাংলা বইয়ে নৌকার ছবি ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বিশেষজ্ঞের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন এনসিটিবির কয়েকজন কর্মকর্তা। তাঁদের দাবি, প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণির বাংলা বইয়ে নৌকার ছবি নিয়ে বিতর্ক তৈরি হলেও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষজ্ঞকে বদলি করা হয়নি।
এ বিষয়ে এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি শিক্ষা মন্ত্রণালয় দেখে। এ ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই। কী কারণে কর্মকর্তাদের বদলি করা হয়েছে, তা-ও তিনি জানেন না বলে উল্লেখ করেন।
সব মিলিয়ে পাঠ্যবইয়ে রাজনৈতিক প্রতীকের ব্যবহার, সংশোধন ও পুনর্মুদ্রণ ঘিরে নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রস্তুতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। একদিকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশোধিত বই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার তাগিদ, অন্যদিকে বাড়তি ব্যয় ও কর্মকর্তাদের বদলি নিয়ে প্রশ্ন—সব মিলিয়ে এনসিটিবির সামনে তৈরি হয়েছে একাধিক চ্যালেঞ্জ।



