নয়াদিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভ ঠেকাতে ব্যাপক পুলিশি তৎপরতা এবং দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের আটকের ঘটনায় ভারতে ১৯৭৫ সালের জরুরি অবস্থার স্মৃতি ফিরে এসেছে বলে মন্তব্য করেছেন আন্দোলনকারীদের নেতারা। তাদের অভিযোগ, সরকারের কঠোর অবস্থান দেশটির গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
সিজেপির আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেছেন, ‘নরেন্দ্র মোদি এইমাত্র জরুরি অবস্থাকে আনুষ্ঠানিক করে ফেলেছেন।’ তার ভাষ্য, ভয়ভীতি দেখিয়ে তরুণদের আন্দোলন থেকে সরিয়ে রাখা সম্ভব হবে না।
দীপকে আরও লেখেন, ভয় দেখানোর এই কৌশল কোনো কাজে আসবে না। তার দাবি, দেশের তরুণরা আর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ভয় পায় না।
১৯৭৫-এর জরুরি অবস্থার সঙ্গে তুলনা
ভারতে ১৯৭৫ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী জরুরি অবস্থা জারি করেছিলেন। সেই সময়ে নাগরিক অধিকার সীমিত করা, সংবাদমাধ্যমে সেন্সরশিপ এবং রাজনৈতিক বিরোধীদের কারাবন্দি করার মতো ঘটনা ঘটে।
বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে ওই সময়ের তুলনা করায় দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
বামপন্থি ছাত্র সংগঠন অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি নেহা বোরাও মোদি সরকারের কঠোর অবস্থানের সমালোচনা করেছেন। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনামলে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন দমনের প্রচেষ্টার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করে তিনি জনগণকে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।
শনিবার (১০ অক্টোবর) দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কঠোর পুলিশি বিধিনিষেধ জারি থাকলেও অনেক তরুণ বিক্ষোভস্থলের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
‘১০ জনকে আটক করলে আরও ৫০ জন আসছে’
দিল্লির কনট প্লেসের বাইরের একটি সড়কে কর্মরত ২৯ বছর বয়সি পরিচ্ছন্নতাকর্মী সন্তোষ কুমার পুলিশের ব্যারিকেডে কিশোর ও তরুণদের আটক হতে দেখে হতাশা প্রকাশ করেন।
তার প্রশ্ন, ‘আপনি এসব ছেলেমেয়েকে কীভাবে থামাবেন? ১০ জনকে আটক করা হচ্ছে, আরও ৫০ জন আসছে।’
সন্তোষ কুমার মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক ভবিষ্যতের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। ২০২৯ সালের নির্বাচনের আগেই মোদি ক্ষমতায় থাকবেন না বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
নেপাল ও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক তরুণ নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের উদাহরণ টেনে সন্তোষ বলেন, ওই দেশগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভারতের তরুণদেরও নিজেদের দেশ ‘ফিরিয়ে নেওয়ার’ সময় এসেছে।
হুইলচেয়ারে মাকে নিয়ে বিক্ষোভের কাছে প্রকৌশলী
বিক্ষোভ ঘিরে সাধারণ মানুষের উদ্বেগের কথাও উঠে এসেছে। ২৮ বছর বয়সি প্রকৌশলী সমীর ইরশাদ তার ৫৭ বছর বয়সি মা শিবা আবদিকে হুইলচেয়ারে নিয়ে কনট প্লেসের একটি পুলিশ ব্যারিকেডের কাছে পৌঁছান।
শিবা আবদি বলেন, দিল্লিতে শান্তিপূর্ণভাবে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি তিনি আগে দেখেননি।
তার প্রশ্ন, ‘সরকার রাজধানীকে দুর্গে পরিণত করেছে কেন? আমার মতো সাধারণ নাগরিকদের নিয়ে তারা এত ভয় পাচ্ছে কেন?’
দিল্লির বাইরেও পুলিশি তৎপরতার অভিযোগ
আন্দোলনকারীদের দাবি, বিক্ষোভ দমনের তৎপরতা শুধু রাজধানী দিল্লির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরের ২৪ বছর বয়সি ছাত্রনেতা আরিফও পুলিশের চাপের অভিযোগ করেছেন।
স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার জেলা পর্যায়ের সমন্বয়ক আরিফ জানান, দিল্লির বিক্ষোভে যোগ দেওয়া ঠেকাতে বৃহস্পতিবার রাতে পুলিশ তার বাড়িতে যায়।
তার দাবি, গভীর রাতে কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তা বাড়ির দরজায় আঘাত করেন এবং পরিবারের সদস্যদের কাছে তার অবস্থান জানতে চান। এরপর থেকে তাকে বাড়িতে আটকে রেখে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
আরিফের অভিযোগ, দিল্লিতে যেতে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি তাকে ফৌজদারি মামলায় জড়ানো এবং ভবিষ্যৎ নষ্ট করে দেওয়ার হুমকিও দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দিল্লিতে গিয়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে দেশের গণতন্ত্র ‘ফিরিয়ে আনার’ আন্দোলনের অংশ হতে চেয়েছিলেন তিনি।
প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগের দাবি
সিজেপির চলমান আন্দোলনের অন্যতম প্রধান দাবি হলো ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ। ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ভারতের নির্বাচন কমিশনের ভেতরে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ভোটার ডেটাবেসে চলমান পরিবর্তনের স্বচ্ছতা নিয়ে অন্য দুই নির্বাচন কমিশনার উদ্বেগ প্রকাশ করলেও জ্ঞানেশ কুমার তা উপেক্ষা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই অভিযোগ ও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যেই দিল্লিতে পুলিশি বিধিনিষেধ এবং আন্দোলনকারীদের আটকের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।



