tanaka
প্রচ্ছদআদালতমরিয়মের আত্মহত্যা: আপসনামা দাখিল, গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর

মরিয়মের আত্মহত্যা: আপসনামা দাখিল, গাজী নজরুলের জামিন নামঞ্জুর

সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের আত্মহত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ভুক্তভোগীর পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে আপসনামা দাখিল করা হয়েছে। তবে আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে দায়ের হওয়া দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারার মামলা আপসযোগ্য নয় উল্লেখ করে আদালত ওই আপসনামা আমলে নেননি বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী।

বুধবার ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মো. সেফাতুল্লাহর আদালতে মামলার আসামি গাজী নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের জামিন শুনানি হয়। শুনানি শেষে আদালত বয়স ও নারী বিবেচনায় মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করেন। তবে গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছে।

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, আত্মহত্যায় প্ররোচনার মামলা আপসযোগ্য নয়। দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা অনুযায়ী এ ধরনের মামলা বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে আপসের মাধ্যমে নিষ্পত্তির সুযোগ নেই। বাদী আপস করলেও এর ফলে মামলা শেষ হয়ে যাবে না।

তিনি আরও বলেন, বাদীকে কোনো ধরনের চাপ প্রয়োগ করে আপস করানো হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।

আপসনামায় যা বলা হয়েছে

আদালতে দাখিল করা আপসনামায় নিহত মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ উল্লেখ করেন, তাৎক্ষণিকভাবে সন্দেহের বশে তাঁর জামাই জিএম নজরুল ইসলাম ও তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের বিরুদ্ধে মামলা করেছিলেন। তবে পারিবারিক ও আত্মীয়তার সম্পর্ক অটুট রাখার স্বার্থে পরবর্তীতে দুই পক্ষের মধ্যে আপস হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আপসনামায় বলা হয়েছে, কারাগারে থাকা গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলাম জামিনে মুক্তি পেলে বাদীপক্ষের কোনো আপত্তি নেই।

নথিতে এস এম মাসুম বিল্লাহ ও মো. আব্দুল হামিদ মোড়লকে যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, মরিয়মের সঙ্গে মামলার এক নম্বর আসামি জিএম নজরুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর নজরুল ইসলামের প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামের সঙ্গেও মরিয়মের হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল এবং তাঁরা একসঙ্গে সংসারজীবন পরিচালনা করছিলেন বলে আপসনামায় দাবি করা হয়েছে।

আপসনামার পরবর্তী অংশে বলা হয়, গত ২০ সেপ্টেম্বর দুপুর আনুমানিক ৩টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টার মধ্যে ঢাকায় নিজ বাসভবনে মরিয়ম আত্মহত্যা করেন। পরে তাঁর জামাই জিএম নজরুল ইসলামের ফোন পেয়ে আনুমানিক সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে তাঁর বাসায় গিয়ে মেয়ের আত্মহত্যার বিষয়টি জানতে পারেন বাবা।

আপসনামায় আরও উল্লেখ করা হয়, মেয়ের জামাইয়ের বাসায় আত্মহত্যার ঘটনা ঘটায় তাৎক্ষণিক সন্দেহের বশে জিএম নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম ও আরও একজনকে আসামি করে শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করেন মরিয়মের বাবা। মামলাটির নম্বর ১৬ (০৯) ২০২৬ এবং এতে দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারা উল্লেখ করা হয়েছে।

পরবর্তীতে দুই পক্ষের মধ্যে আপস-মীমাংসা হয়েছে জানিয়ে আপসনামায় বলা হয়, আসামিরা জামিনে মুক্তি পেলে বাদী বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের আপত্তি নেই। একই সঙ্গে উভয় পক্ষ ভবিষ্যতে হৃদ্যতাপূর্ণ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার চেষ্টা করবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে আপসনামায় বলা হয়েছে, মামলার বিচারিক কার্যক্রমে উভয় পক্ষ নির্লিপ্ত থেকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।

নথির শেষাংশে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ স্বেচ্ছায়, স্বজ্ঞানে এবং অন্য কারও প্ররোচনা ছাড়া আপসনামাটি পড়ে এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে অবগত হয়ে তাতে স্বাক্ষর করেছেন। নথিতে আপসনামাটি ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে সত্যায়িত করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। এতে দুই পক্ষের স্বাক্ষরের পাশাপাশি শনাক্তকারীর স্বাক্ষরও রয়েছে।

আসামিপক্ষের বক্তব্য

আসামিপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, বাদী আপসনামায় স্বাক্ষর করেছেন এবং দুই আসামির জামিনের বিষয়ে তাঁর কোনো আপত্তি নেই। সেই আপসের ভিত্তিতেই কারাগারে থাকা গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামের জামিন চাওয়া হয়েছিল।

আইনজীবী বলেন, তাঁর মক্কেলরা ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন। ইতোমধ্যে বাদীপক্ষের সঙ্গে আপস-মীমাংসা হয়েছে এবং শুনানিতে উপস্থিত থেকে বাদী দুই আসামির জামিনে আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন।

তবে আদালত মাকছুদা ইসলামের জামিন মঞ্জুর করলেও গাজী নজরুল ইসলামের জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। এ বিষয়ে পরবর্তী সময়ে আবার জামিন আবেদন করা হবে অথবা উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছেন আসামিপক্ষের আইনজীবী।

রিমান্ডে পুলিশের যে তথ্য

এর আগে গত সোমবার দুই দফায় মোট আট দিনের রিমান্ড শেষে গাজী নজরুল ইসলামকে কারাগারে পাঠানো হয়। রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে ওইদিন তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে জানান, ন্যাম ভবনের ফ্ল্যাটে গাজী নজরুল ইসলাম তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলামকে নিয়ে শয়নকক্ষে থাকতেন। অন্যদিকে দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়মকে শয়নকক্ষের পাশের বারান্দায় মাঝেমধ্যে রাত কাটাতে হতো।

তদন্তে মরিয়ম শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন—এমন তথ্য পাওয়ার কথা আদালতকে জানিয়েছিল পুলিশ। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মামলার তদন্ত এখনো চলমান।

যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত

গত ২০ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানার ন্যাম ভবনের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাট থেকে সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম আক্তারের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই সময় ফ্ল্যাটের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। পরে সিআইডির সহায়তায় দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত অবস্থায় মরিয়মের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তাঁর কক্ষে কিছু চিরকুটও পাওয়া যায় বলে পুলিশ জানিয়েছে।

ঘটনার পরদিন মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে জিএম নজরুল ইসলাম, তাঁর প্রথম স্ত্রী মাকছুদা ইসলাম এবং নিহতের মামা ওবায়দুর রহমানের বিরুদ্ধে শেরেবাংলানগর থানায় মামলা করেন।

মামলা দায়েরের পর রাতেই গাজী নজরুল ইসলাম ও মাকছুদা ইসলামকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে মাকছুদা ইসলামকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। রিমান্ড শেষে তিনিও কারাগারে রয়েছেন।

মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা মামলায় বাদীপক্ষের আপসনামা দাখিল হলেও দণ্ডবিধির ৩০৬ ধারার মামলা আইনগতভাবে কীভাবে এগোবে, তা তদন্ত ও আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমে নির্ধারিত হবে।