সরকার গঠনের প্রায় ১৮০ দিন পর মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে জোর আলোচনা চলছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সড়ক পরিবহন, তথ্য ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়সহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পরিবর্তন আনা হতে পারে বলে বিভিন্ন মহলে গুঞ্জন রয়েছে। একই সঙ্গে মন্ত্রিসভার আকারও বাড়তে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, গত ছয় মাসে মন্ত্রীদের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন, কিছু বিতর্কিত বক্তব্য এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা বিবেচনায় নিয়েই সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। যদিও এ বিষয়ে সরকারিভাবে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
সম্প্রতি ব্যয় সংকোচনের অংশ হিসেবে ১৮ জন মন্ত্রীর পুলিশ এসকর্ট প্রত্যাহারের পর থেকেই সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়। এর পাশাপাশি এক প্রতিমন্ত্রীর ব্যক্তিগত আচরণসংক্রান্ত একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ায় নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে বেশি আলোচনা
সম্ভাব্য রদবদলের আলোচনায় সবচেয়ে বেশি রয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। দুর্যোগকালীন পরীক্ষা আয়োজন এবং কয়েকটি বক্তব্য নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন। রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে, তাকে অন্য কোনো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। তার স্থানে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র ও উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের নামও আলোচনায় এসেছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েও পরিবর্তনের গুঞ্জন রয়েছে। বিভিন্ন বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল সমালোচনার মুখে পড়েছেন। আদ-দ্বীন ফাউন্ডেশন সম্পর্কে তার এক বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী তাকে মূল বিষয়ে থাকার পরামর্শ দেন। এ অবস্থায় স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. এম এ মুহিতকে পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে বলে আলোচনা রয়েছে।
বিতর্কে কয়েকজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনকে নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা রয়েছে। একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা সংক্রান্ত ঘটনায় তার বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তথ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও নতুন টেলিভিশন লাইসেন্স অনুমোদনে তদবিরের অভিযোগ নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। যদিও সংশ্লিষ্ট দপ্তর অভিযোগটি অস্বীকার করেছে।
এদিকে এক প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ এবং একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তার দপ্তরেও পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা চলছে।
পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি দাবি করেন, ভিডিওটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। তবে একটি ফ্যাক্ট-চেকিং প্ল্যাটফর্মের দাবি, ভিডিওটিতে এআই ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পুনর্বিন্যাসের আলোচনা
বর্তমানে সড়ক পরিবহন, রেলপথ ও নৌপরিবহন—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে রয়েছেন শেখ রবিউল আলম। প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল করতে তার দায়িত্ব পুনর্বিন্যাস করা হতে পারে বলে বিভিন্ন সূত্রে আলোচনা রয়েছে।
নতুন মুখ যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা
মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ হলে কয়েকজন সংসদ সদস্য নতুন করে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেতে পারেন বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন রয়েছে। আলোচনায় থাকা নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক, এ বি এম মোশাররফ হোসেন, আব্দুস সালাম আজাদ, অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়া, খন্দকার আবু আশফাক, নজরুল ইসলাম আজাদ এবং মো. মজিবুর রহমান।
এছাড়া টেকনোক্র্যাট কোটায় কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতার নামও আলোচনায় রয়েছে। জোটের শরিক দল থেকেও নতুন সদস্য অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে।
সরকার যা বলছে
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নির্দিষ্ট সময় পর সরকারের কাজের মূল্যায়ন করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সেই মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন প্রধানমন্ত্রী।
বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, সম্ভাব্য রদবদল নিয়ে নানা আলোচনা থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত হয়নি।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন বলেন, সরকারের কার্যক্রমের মূল্যায়নের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা স্বাভাবিক বিষয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক নুরুল আমিন বেপারীর মতে, প্রশাসনের কার্যকারিতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজন হলে মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন আনা অস্বাভাবিক নয়। তার মতে, বিতর্ক এড়িয়ে প্রশাসনের গতি বাড়ানোই এমন সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য হতে পারে।



