tanaka

জলবায়ু অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণে উন্নত দেশগুলোকে আহ্বান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোকে অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি পূরণ, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য তহবিল পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করা এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন...
প্রচ্ছদজাতীয়ভোটের মাঠে শঙ্কা বাড়াচ্ছে ‘টার্গেট কিলিং

ভোটের মাঠে শঙ্কা বাড়াচ্ছে ‘টার্গেট কিলিং

জাতীয় নির্বাচনের বহুল প্রত্যাশিত তফসিল ঘোষণা হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঘিরে তৈরি হয়েছে নতুন উদ্বেগ। তফসিলের পরদিনই ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনা উৎকণ্ঠা বাড়িয়েছে আরও।আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করে একের পর এক গোলাগুলির ঘটনা ঘটছে কয়েক মাস ধরে। বাড়ছে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। গত ১১ মাসে দেশে রাজনৈতিক খুন ৯৮টি। ভোটের মাঠে সন্ত্রাস ও সহিংসতার আশঙ্কায় নানান স্তরে ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকা অপরিহার্য হলেও বাস্তবে তার চিত্র এখনো প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছায়নি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভয়হীন ভোটের পরিবেশ গড়ে তুলতে দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। অবৈধ অস্ত্রধারী ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার নিশ্চিত না করা গেলে নির্বাচন ঘিরে নিরাপত্তা ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, হরহামেশাই আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। ৫ আগস্টের পর পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র, জমা না দেওয়া অস্ত্র এবং অবৈধ অস্ত্রের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অবিলম্বে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’ চালু করা হবে।

গোলাগুলির ঘটনায় এক ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে। সবশেষ, গত শুক্রবার খোদ রাজধানীতে ফিল্মি স্টাইলে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্রে জানা যায়, হাদিকে টার্গেট করে যে গুলি করা হয় সেটি ছিল সাইলেন্সার লাগানো অস্ত্র। এ কারণে গুলি হলেও শব্দ খুব বেশি হয়নি। এর আগে রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। তার আগে গত মাসেই চট্টগ্রামে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে তাকে লক্ষ্য করে গুলির ঘটনা ঘটে। দেশের বিভিন্ন জেলায় রাজনৈতিক দলের বেশ কয়েকজন ছোট-বড় নেতাও হত্যার শিকার হয়েছেন। অধিকাংশই ছিল ‘টার্গেট কিলিং’। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ভোটের দিনক্ষণ ঘনিয়ে আসার আগেই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও ভালো করতে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সারা দেশে পুলিশকে সতর্ক অবস্থানে থেকে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের দমন ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে শিগগির ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’ চালু করা হবে। এ অভিযানের ফলে জনমনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে বলে মনে করছেন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘রাজনৈতিক সহিংসতা, হত্যা, আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসার নিয়ন্ত্রণে অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে। এসব অস্ত্রের একটি অংশ আসে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্র আসা ঠেকাতে নিরাপত্তা জোরদার ও দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে সাঁড়াশি অভিযান চালাতে হবে। তা না হলে নির্বাচন ছাড়াও নানা সহিংসতায় এসব অস্ত্র ব্যবহার করবে দুর্বৃত্তরা।’ মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, ২০২৪ সালে দেশে ৬৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ১০০ জন মারা গেছেন। আহত হয়েছেন ৬ হাজার ১৯০ জন।

চলতি বছর জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসেই ৩৮১টি রাজনৈতিক সহিংসতায় খুন হয়েছেন ৯৮ জন।

গত কয়েক মাসে ঘটে যাওয়া অপরাধ কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলেও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভালো-মন্দ নির্ধারক প্রায় সব সূচকই নিম্নমুখী। খোদ রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় একের পর এক প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার মতো ঘটনা ঘটছে। ক্ষুদ্র সংঘাতেও চলছে আগ্নেয়াস্ত্রের মহড়া। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দেশে সেপ্টেম্বর মাসে ২৯৭টি খুনের মামলা হয়। অক্টোবরে এ সংখ্যা ছিল ৩২০টি। অর্থাৎ, সেপ্টেম্বরের তুলনায় অক্টোবরে ২৩টি খুনের মামলা বেশি হয়। গত বছরের অক্টোবর মাসে সারা দেশে ৩৯৯টি খুনের মামলা হয়েছিল। চলতি বছরের সেপ্টেম্বরে ৫০টি ডাকাতির মামলা হলেও অক্টোবরে তা ছয়টি বেড়েছে। যদিও গত বছরের অক্টোবরে ৬৮টি ডাকাতির মামলা হয়। গত সেপ্টেম্বরে ১৬৯টি দস্যুতা বা ছিনতাই মামলা হলেও পরের মাসে তা ১০টি বেড়ে ১৭৯টি হয়। অবশ্য গত বছরের একই মাসে ৩৯৯টি ছিনতাই মামলা হয়েছিল। চলতি বছরের অক্টোবরে অপহরণের ঘটনায় ১১০টি মামলা হলেও গত সেপ্টেম্বরে ছিল ৯৬টি। এছাড়া ওই দুই মাসে সংঘটিত অপরাধ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সেপ্টেম্বর মাস থেকে অক্টোবরে চুরির মতো অপরাধও বেড়েছে।

গত সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে খুনের মামলা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মেট্রোপলিটন এলাকাগুলোর মধ্যে অক্টোবরে ঢাকায় ২২টি এবং গাজীপুর মেট্রোপলিটন এলাকায় ১১টি হত্যা মামলা হয়। তবে সেপ্টেম্বরে ঢাকায় এ সংখ্যা ছিল ২৫টি এবং গাজীপুরে মাত্র তিনটি। পুলিশের রেঞ্জগুলোর মধ্যে অক্টোবরে ঢাকা রেঞ্জে ৫৯টি হত্যা মামলা হলেও আগের মাসে তা ১৮টি কম ছিল। চট্টগ্রাম রেঞ্জে সেপ্টেম্বরে ৫৫টি হত্যা মামলা হলেও অক্টোবরে তা বেড়ে হয়েছে ৫৯টি। এছাড়া খুলনা রেঞ্জে ৩৪টি এবং রাজশাহী রেঞ্জে ৪১টি হত্যা মামলা হয়। যদিও এর আগের মাসে এই দুটি রেঞ্জে যথাক্রমে ২৭টি ও ২৬টি হত্যা মামলা হয়েছিল।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সূত্র জানায়, গত বছর গণঅভ্যুত্থানের পর বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশ স্থাপনা থেকে বিপুলসংখ্যক অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়ে যায়। অবৈধ এসব অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চললেও পুরোপুরি সফলতা আসেনি। এখনো বিভিন্ন ধরনের এক হাজার ৩৪০টি অস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজার ২৮০টি গোলাবারুদ উদ্ধার করা যায়নি। এসব অস্ত্র-গুলিও বড় চিন্তার কারণ। এমপি প্রার্থীরা চাইলে আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নিতে পারবেন
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী শনিবার (১৩ ডিসেম্বর) সাংবাদিকদের বলেন, আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স এতদিন শুধু সামরিক ও বেসামরিক কর্মচারীদের অনুকূলে ইস্যু করা হতো। এখন জাতীয় নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে যারা আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স চাইবেন, তাদেরও লাইসেন্স ইস্যু করা হবে।

সন্ত্রাসী দমনে আসছে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেন, জাতীয় নির্বাচনে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ ও ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের দমনের উদ্দেশ্যে অবিলম্বে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’ চালু করা হবে। লুট হওয়া ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান চলমান। এটি আরও জোরদার ও বেগবান করার জন্য এবং ফ্যাসিস্ট সন্ত্রাসীদের দমনে কোর কমিটি ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট: ফেজ-২’ অবিলম্বে চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক উইং কমান্ডার এম জেড এম ইন্তেখাব চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘গুলির ঘটনার পর র‍্যাব-৩, র‍্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিট ও র‍্যাবের সবগুলো টিম দুই অপরাধীকে আটকে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হয়তো ভালো খবর জানাতে পারবো আমরা।’

‘মানুষের ভোটাধিকারের চেয়ে জীবনের মূল্য বেশি’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, ‘তফসিলের আগে চট্টগ্রামে একজন প্রার্থীকে গুলি করে সন্ত্রাসীরা, তফসিলের একদিনের পর গণঅভ্যুথানের অন্যতম সংগঠক ওসমান হাদির ওপর যে আক্রমণ- এটি সন্দেহ নেই অন্য প্রার্থীদের আতঙ্কে রাখবে।’

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ভয়ভীতি কাজ করবে এবং ভোটারদের নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বিধা-দ্বন্দ্বে রাখবে। কারণ, মানুষের ভোটাধিকারের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। চট্টগ্রামে প্রার্থীর ওপর গুলির ঘটনার পরই যদি সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জোরালোভাবে ব্যবস্থা নিতে পারতো তবে এখনকার পরিস্থিতি হয়তো দেখতে হতো না।’

এই অপরাধ বিশেষজ্ঞ বলেন, ‘অপরাধীরা দেখছে গুলি-হামলা করে খুব একটা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে না। বরং তাদের হামলা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষির প্রতিযোগিতা চলে। কোনো হামলা, আক্রমণ বা অপরাধ নিয়ে যখন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রেষারেষির প্রতিযোগিতা চলে তখন অপরাধীরা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখনো অপরাধীদের মধ্যে ভয়ের জায়গা তৈরি করতে পারেনি। অপরাধী যে রাজনৈতিক দলের পরিচয়েই থাকুক না কেন তাদের আইনগত ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করলে পরিত্রাণ ঘটবে।’