tanaka

ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা চলছে নানা হিসাব-নিকাশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে...
প্রচ্ছদটপ নিউজভিসা প্রতারণায় শত শত শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ

ভিসা প্রতারণায় শত শত শিক্ষার্থীর স্বপ্নভঙ্গ

বিদেশে উচ্চশিক্ষা, স্কুলিং ভিসা ও ওয়ার্ক পারমিটের প্রলোভন দেখিয়ে শত শত শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের কাছ থেকে অন্তত ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে রাজধানীর ভিসা কনসালট্যান্ট প্রতিষ্ঠান জাস্ট থট এডুকেশন-এর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ভুয়া অফার লেটার, নিশ্চিত ভিসার আশ্বাস এবং আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাদের কাছ থেকে ধাপে ধাপে লাখ লাখ টাকা আদায় করা হয়েছে।

ফেনীর নূর নাদিয়া জানান, দুই সন্তানকে স্কুলিং ভিসায় কানাডায় পাঠানোর জন্য গত বছরের ডিসেম্বরে আত্মীয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। প্রতিষ্ঠানটির কাউন্সিলরদের আশ্বাসে দুই সন্তান ও নিজের ভিসা প্রসেসের জন্য অফার লেটার পাওয়ার পর তিনি ব্যাংক ও সরাসরি মিলিয়ে ২৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। পরে যাচাই করে জানতে পারেন, দেওয়া অফার লেটারটি ছিল ভুয়া।

নূর নাদিয়ার ভাষ্য, “তারা এতটাই বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলেছিল যে সন্দেহ করার সুযোগ ছিল না। এমনকি বলেছিল, এ বছরই ভিসা হয়ে যাবে, তাই সন্তানদের অন্য কোথাও ভর্তি না করানোর পরামর্শ দিয়েছিল।”

একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের তাহমিনা আক্তার। ফেসবুকের বিজ্ঞাপন দেখে এক বান্ধবীসহ মাল্টার ভিসার জন্য আবেদন করেন তিনি। অফার লেটার পাওয়ার পর ভিসা ও টিউশন ফি বাবদ ১৩ লাখ টাকা দিলেও শেষ পর্যন্ত আর কোনো অগ্রগতি হয়নি।

তাহমিনা অভিযোগ করেন, ভিসা না হওয়ার পর টাকা ফেরতের আশ্বাস দিয়ে তাদের চেক দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকে গিয়ে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট হিসাবে মাত্র ৬ হাজার টাকা রয়েছে।

সুনামগঞ্জের আরিফুল ইসলামও কানাডা যাওয়ার আশায় ৮ লাখ টাকা দেন। কিন্তু ভিসা না পাওয়ার পাশাপাশি টাকাও ফেরত পাননি। তিনি বলেন, আত্মীয়দের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে এবং বাবার জমি বিক্রি করে টাকা জোগাড় করেছিলেন। এখন ঋণের চাপে মানবেতর জীবন কাটছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হারুন অর রশিদ ওরফে মতিউর রহমান পরিকল্পিতভাবে ভুয়া অফার লেটার ও নিশ্চিত ভিসার প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। তাদের হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৬ শতাধিক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এই প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

অভিযোগ রয়েছে, বিদেশে উচ্চশিক্ষায় পাঠানোর নামে প্রতারণা ও মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় সম্প্রতি আটক হওয়া ক্যামব্রিয়ান এডুকেশন গ্রুপ ও বিএসবি গ্লোবাল নেটওয়ার্কের মালিক লায়ন এম. কে. খায়রুল বাশারের নিকটাত্মীয় মতিউর রহমান। সম্পর্কে তারা চাচা-ভাতিজা।

ভুক্তভোগীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, মাল্টা, স্পেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ফিনল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, ফ্যামিলি ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও ভিসা প্রসেসিংয়ের নামে কার্যক্রম পরিচালনা করত প্রতিষ্ঠানটি। গত ৩ জুলাই রাজধানীর বাড্ডা, গুলশান ও বনানীসহ সব অফিস বন্ধ করে সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুরুতে তুলনামূলক কম টাকা নেওয়া হলেও পরে অফার লেটার, টিউশন ফি, ভিসা প্রসেসিং, বায়োমেট্রিক, মেডিকেল, জিএসআইসি, বীমা ও দূতাবাস-সংক্রান্ত নানা খাত দেখিয়ে কয়েক ধাপে ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো।

চার আসামি রিমান্ডে

প্রতারণার মাধ্যমে ৯১ শিক্ষার্থীর ৮ কোটি ৩৮ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ৮ জুলাই রাজধানীর ভাটারা থানায় মামলা করেন শরীয়তপুরের আল আমিন। ওই মামলার ভিত্তিতে বিদেশে পালানোর প্রস্তুতিকালে গত সোমবার রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে মতিউর রহমানকে আটক করে পুলিশ। পরে প্রতিষ্ঠানটির আরও তিন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

আদালত চার আসামির রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন। রিমান্ডে যাওয়া অন্য তিনজন হলেন রাবেয়া খাতুন তানিয়া, সাইদুর রহমান ও মো. তানজির ইসলাম। তানজিরের চার দিন এবং বাকি তিনজনের পাঁচ দিনের রিমান্ড অনুমোদন করা হয়েছে।

শুনানি শেষে পুলিশ হেফাজতে থাকা আসামিদের আদালত প্রাঙ্গণ থেকে হাজতখানায় নেওয়ার সময় ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা তাদের লক্ষ্য করে বিক্ষোভ, গালাগাল ও হামলার চেষ্টা করেন। পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে আসামিদের নিরাপদে হাজতখানায় নিয়ে যায়।

তদন্ত কর্মকর্তা উপপরিদর্শক মো. বিল্লাল ভূঁইয়া সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী গোলাম মর্তুজা ইবনে ইসলাম রিমান্ডের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। আদালত সূত্র জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের একজন ইতোমধ্যে নিজের সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

এদিকে আদালতে উপস্থিত ডিএমপির প্রসিকিউশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মহিউদ্দিন মাহমুদ সোহেল বলেন, আসামিদের ওপর হামলার চেষ্টা হলেও দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা তা প্রতিহত করেন। হাজতখানার ভেতরে কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি।

এর আগে ও পরে সিএমএম আদালত প্রাঙ্গণে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে প্রতারিত অর্থ ফেরত এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান।