মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা কিংবা জ্বর হলেই অনেকের প্রথম ভরসা ব্যথানাশক ওষুধ। আবার সামান্য সংক্রমণ বা জ্বর দেখা দিলেই কেউ কেউ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। এতে দ্রুত স্বস্তি মিললেও নিজের ইচ্ছায় কিংবা দীর্ঘদিন এসব ওষুধ ব্যবহারের অভ্যাস শরীরের জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে। বিশেষ করে নিয়মিত বা দীর্ঘ সময় ব্যথানাশক গ্রহণে কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এমন আশঙ্কার কথা জানিয়ে ব্যথানাশক ও অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সেন্ট্রাল ড্রাগস স্ট্যান্ডার্ড কন্ট্রোল অর্গানাইজেশন (সিডিএসসিও)। চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, ওষুধ বিক্রেতা ও সাধারণ মানুষকে এসব ওষুধ ব্যবহারে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।
কেন ব্যথানাশক নিয়ে সতর্কতা?
ব্যথা ও প্রদাহ কমাতে ব্যবহৃত নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগস বা এনএসএআইডি বহুল ব্যবহৃত ওষুধ। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি, ঘন ঘন বা দীর্ঘ সময় এসব ওষুধ গ্রহণ করলে কিডনির ওপর বাড়তি চাপ পড়তে পারে।
বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই কিডনির সমস্যা রয়েছে, পানিশূন্যতায় ভুগছেন, হৃদরোগ রয়েছে অথবা কিডনি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি—তাদের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ ব্যবহারে আরও সতর্কতা প্রয়োজন।
তাই ব্যথা হলেই নিজের সিদ্ধান্তে বারবার ব্যথানাশক না খেয়ে প্রথমে উপসর্গের কারণ বোঝা জরুরি। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ওষুধ গ্রহণ করাই নিরাপদ।
অ্যান্টিবায়োটিক মানেই সব সংক্রমণের ওষুধ নয়
জ্বর, সর্দি বা সাধারণ অসুস্থতা হলেই অনেকে অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া শুরু করেন। অথচ বেশিরভাগ সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন হয় না।
চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণের ফলে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ সেবনের পাশাপাশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকিও বাড়তে পারে। এর অর্থ হলো, ভবিষ্যতে প্রয়োজনের সময় নির্দিষ্ট অ্যান্টিবায়োটিক জীবাণুর বিরুদ্ধে আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক খেলে যেসব ভুল করবেন না
চিকিৎসক অ্যান্টিবায়োটিক দিলে নির্ধারিত নিয়ম ও মাত্রা মেনে তা সেবন করা জরুরি। নিজের ইচ্ছায় ওষুধের ডোজ পরিবর্তন করা, অন্যের জন্য দেওয়া অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়া কিংবা আগের অসুস্থতার সময় বেঁচে যাওয়া ওষুধ পরবর্তী অসুস্থতায় ব্যবহার করা ঠিক নয়।
আবার কয়েকদিন ওষুধ খাওয়ার পর উপসর্গ কমে গেলে নিজের সিদ্ধান্তে চিকিৎসা বন্ধ করা কিংবা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সময় চালিয়ে যাওয়াও উচিত নয়। কতদিন এবং কী মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত।
চিকিৎসকের পরামর্শ কেন জরুরি?
একই ধরনের উপসর্গের পেছনে ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই রোগীর বয়স, শারীরিক অবস্থা, অন্য কোনো রোগ রয়েছে কি না, বর্তমানে কী কী ওষুধ সেবন করছেন এবং কিডনির কার্যকারিতা কেমন—এসব বিষয় বিবেচনা করেই ওষুধ নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ভারতের ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থা সিডিএসসিও চিকিৎসকদের এনএসএআইডি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কম কার্যকর মাত্রা এবং প্রয়োজন হলে সবচেয়ে কম সময়ের জন্য ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করতে বলেছে। বিশেষ করে কিডনি সমস্যার ঝুঁকিতে থাকা রোগীদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রেও সংক্রমণের ধরন, তীব্রতা, আক্রান্ত স্থান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে ওষুধ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ওষুধের দোকান থেকেও সতর্কতা জরুরি
শুধু রোগী বা চিকিৎসক নয়, ওষুধ বিক্রির ক্ষেত্রেও সতর্কতা প্রয়োজন। সিডিএসসিও ফার্মাসিস্ট ও খুচরা বিক্রেতাদের প্রেসক্রিপশন ছাড়া নির্দিষ্ট ওষুধ বিক্রি না করার নিয়ম কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশ দিয়েছে।
বিশেষ করে অ্যান্টিবায়োটিক এবং প্রেসক্রিপশন-নির্ভর ব্যথানাশক ওষুধের ক্ষেত্রে রোগীদের নিজের মতো করে ওষুধ ব্যবহারে উৎসাহিত না করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সুস্থ কিডনির জন্য সচেতনতা জরুরি
কিডনি শরীর থেকে বর্জ্য পদার্থ বের করে দেওয়ার পাশাপাশি শরীরের তরল ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য বজায় রাখতে ভূমিকা রাখে। তাই কিডনির সুরক্ষায় ওষুধ ব্যবহারে সচেতন থাকা জরুরি।
প্রয়োজন ছাড়া ওষুধ না খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা এবং কোনো শারীরিক সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া—এসব অভ্যাস কিডনি সুস্থ রাখতে সহায়ক হতে পারে।
ওষুধের কার্যকারিতা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সঠিক রোগে, সঠিক মাত্রায় এবং সঠিক সময়ে ওষুধ ব্যবহার করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাময়িক স্বস্তির জন্য নিজের মতো করে ব্যথানাশক বা অ্যান্টিবায়োটিক গ্রহণ না করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।



