বিশ্ববিদ্যালয় জীবন মানেই নতুন পরিবেশ, নতুন বন্ধু, নানা আয়োজন, পড়াশোনার চাপ আর অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত জেগে থাকা। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার শুরুর দিকে নতুন রুটিনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে গিয়ে অনেক শিক্ষার্থীরই ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটে। অথচ পর্যাপ্ত ঘুম শুধু শরীরকে সতেজ রাখে না, পড়াশোনা, স্মৃতিশক্তি এবং মানসিক সুস্থতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ঘুমের ঘাটতি হলে মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তি কমে যেতে পারে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ঘুমের অনিয়ম শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও ঘুমকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
কেন ঘুমের রুটিন নষ্ট হয়?
বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, হলের শেয়ার করা কক্ষে থাকা, রাত জেগে আড্ডা কিংবা পড়াশোনার চাপ—সব মিলিয়ে প্রথম কয়েক সপ্তাহে অনেক শিক্ষার্থীর ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো হয়ে যায়।
ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে কেউ কেউ দিনের বেলায় অতিরিক্ত কফি বা এনার্জি ড্রিংকস পান করেন। কিন্তু অতিরিক্ত ক্যাফেইন গ্রহণ উল্টো রাতে ঘুমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে তৈরি হয় ঘুমের অনিয়মের একটি চক্র।
ভালো ঘুমের জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
শিক্ষার্থীদের ঘুমের রুটিন স্বাভাবিক রাখতে কয়েকটি সহজ অভ্যাস অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
সকালের প্রাকৃতিক আলো নিন:
সকাল ১১টার মধ্যে কিছু সময় বাইরে কাটানোর চেষ্টা করুন। সকালের প্রাকৃতিক আলো শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বা বডি ক্লক ঠিক রাখতে সাহায্য করে। এতে ঘুম ও জেগে ওঠার স্বাভাবিক চক্রও বজায় থাকে।
জোর করে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন না:
বিছানায় যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ঘুম না এলে অস্থির হয়ে শুয়ে না থেকে কিছুক্ষণ শান্ত কোনো কাজ করতে পারেন। ঘুম না আসা অবস্থায় দীর্ঘ সময় বিছানায় পড়ে থাকলে বিছানার সঙ্গে দুশ্চিন্তা ও অস্থিরতার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
ঘুমের আগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলুন:
ঘুমানোর অন্তত দেড় ঘণ্টা আগে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের ব্যবহার বন্ধ রাখার চেষ্টা করুন। বিশেষ করে ভিডিও বা রিলস স্ক্রল করার অভ্যাস মস্তিষ্ককে সজাগ রাখে, ফলে সহজে ঘুম নাও আসতে পারে।
ঘুমের আগে মনকে শান্ত করুন:
ঘুমানোর আগে হালকা গরম পানিতে গোসল, বই পড়া কিংবা শান্ত ধরনের গান শোনার মতো আরামদায়ক অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। এতে শরীর ও মন ঘুমের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।
বিছানা শুধু ঘুমের জন্য রাখুন:
বিছানায় বসে খাওয়া, দীর্ঘ সময় পড়াশোনা করা কিংবা ল্যাপটপে কাজ করার অভ্যাস এড়িয়ে চলুন। সম্ভব হলে বিছানাকে শুধু ঘুম ও বিশ্রামের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করুন। এতে বিছানার সঙ্গে ঘুমের একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক তৈরি হতে পারে।
অসুস্থতা ও যাতায়াতের চাপও বড় কারণ
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শুরুতে ঠান্ডা, সর্দি-কাশি বা অন্যান্য সাধারণ অসুস্থতাও ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। তাই নিয়মিত হাত পরিষ্কার রাখা এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, যেসব শিক্ষার্থীকে প্রতিদিন দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়, তাদের অনেকেরই ঘুমের জন্য পর্যাপ্ত সময় বের করা কঠিন হয়ে পড়ে। অতিরিক্ত যাতায়াতের ক্লান্তি দিনের শেষভাগের পড়াশোনা ও অন্যান্য কাজেও প্রভাব ফেলতে পারে।
রাত জাগাকে অভ্যাসে পরিণত না করার পরামর্শ
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাত জাগাকে স্মার্টনেস বা আধুনিক জীবনযাপনের অংশ হিসেবে দেখার কোনো কারণ নেই। বরং পড়াশোনায় মনোযোগ ধরে রাখা, স্মৃতিশক্তি ভালো রাখা এবং শারীরিক-মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে নিয়মিত ঘুমের রুটিন অনুসরণ করা জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তাই নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো ও জেগে ওঠার অভ্যাস গড়ে তোলা, ঘুমের আগে স্ক্রিন এড়িয়ে চলা এবং পর্যাপ্ত বিশ্রাম নেওয়াকে শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।



