tanaka

ডিসেম্বর ঘিরে রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা চলছে নানা হিসাব-নিকাশ

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই মুহূর্তে সবচেয়ে আলোচিত শব্দগুলোর একটি ‘ডিসেম্বর’। ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে...
প্রচ্ছদজাতীয়বাংলাদেশে ৩৮.৬ শতাংশ মানুষের নাগালের বাইরে স্বাস্থ্যকর খাবার

বাংলাদেশে ৩৮.৬ শতাংশ মানুষের নাগালের বাইরে স্বাস্থ্যকর খাবার

বাংলাদেশে এখনও প্রতি পাঁচজনের মধ্যে প্রায় দুজন মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। ২০২৫ সালের হিসাবে দেশের প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখ মানুষ পুষ্টিকর খাদ্য কিনতে সক্ষম ছিলেন না। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পর বাংলাদেশেই এ হার সবচেয়ে বেশি।

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) প্রকাশিত জাতিসংঘের পাঁচটি সংস্থার যৌথ প্রতিবেদন ‘দ্য স্টেট অব ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড নিউট্রিশন ইন দ্য ওয়ার্ল্ড ২০২৬’-এ এ তথ্য উঠে এসেছে।

প্রতিবেদনটি যৌথভাবে প্রকাশ করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ), ইউনিসেফ, বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে পাকিস্তানে ৬৩ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য ছিল না। একই সময়ে বাংলাদেশে এ হার ছিল ৩৮.৬ শতাংশ।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় কী রয়েছে?

প্রতিবেদনে ‘হেলদি ডায়েট বাস্কেট‘ বলতে এমন একটি খাদ্যতালিকাকে বোঝানো হয়েছে, যা একজন মানুষের দৈনিক ২ হাজার ৩৩০ কিলোক্যালরি শক্তির চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম। এতে ছয়টি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে—শর্করা, প্রাণিজ আমিষ, শুঁটিজাতীয় খাদ্য, বাদাম ও বীজ, শাকসবজি, ফলমূল এবং তেল-চর্বি।

বৈশ্বিক চিত্র

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্বে প্রায় ২৬৯ কোটি মানুষ, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার ৩২.৭ শতাংশ, স্বাস্থ্যকর খাদ্য কিনতে পারেননি।

এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে আফ্রিকা, যেখানে ৬৬.৬ শতাংশ মানুষের স্বাস্থ্যকর খাবার কেনার সামর্থ্য নেই। এরপর রয়েছে এশিয়া (২৮.৯ শতাংশ) এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল (২৫.৭ শতাংশ)।

বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন বলেন, নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য এখনও স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করা কঠিন।

তার মতে, দুধ, দুগ্ধজাত পণ্য, মাছ, মাংস ও ফলের উচ্চমূল্যের কারণে সাধারণ মানুষ প্রয়োজনীয় পরিমাণে এসব খাবার গ্রহণ করতে পারছেন না।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বাড়লে দেশের বাজারেও দ্রুত তার প্রভাব পড়ে। কিন্তু বিশ্ববাজারে দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে সেই সুবিধা পৌঁছাতে অনেক সময় লাগে। ফলে মানুষের আয় কিছুটা বাড়লেও স্বাস্থ্যকর খাবার এখনও অনেকের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে।

স্বাস্থ্যকর খাবারের খরচ বেড়েছে

প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে একজন মানুষের দৈনিক স্বাস্থ্যকর খাদ্য নিশ্চিত করতে গড় ব্যয় ২০১৭ সালের ৩.০৯ ডলার (পিপিপি) থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ৪.৫৯ ডলারে পৌঁছেছে।

এখানে ‘পিপিপি’ বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা (Purchasing Power Parity) বলতে বোঝানো হয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রে ৪.৫৯ ডলারে যে পরিমাণ পণ্য কেনা যায়, বাংলাদেশে সেই সমপরিমাণ পণ্য কিনতে যত স্থানীয় মুদ্রা প্রয়োজন।

এই ব্যয়ের সবচেয়ে বড় অংশ যায় প্রাণিজ আমিষ, শাকসবজি ও ফলমূল কেনায়। তুলনামূলকভাবে শর্করাজাতীয় খাদ্যের পেছনে ব্যয় কম।

দক্ষিণ এশিয়ায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দৈনিক ব্যয়ের দিক থেকে ভুটান (৬.১৭ ডলার) ও শ্রীলঙ্কার (৫.২১ ডলার) পর বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। অন্যদিকে পাকিস্তানে স্বাস্থ্যকর খাবারের গড় ব্যয় সবচেয়ে কম, ৩.৯৪ ডলার হলেও দেশটিতে এ ধরনের খাবার কিনতে অক্ষম মানুষের হার সবচেয়ে বেশি।

কিছুটা উন্নতি হলেও সংকট রয়ে গেছে

বাংলাদেশে স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে অক্ষম মানুষের সংখ্যা আগের তুলনায় কমেছে। ২০১৭ সালে যেখানে ৬২.৮ শতাংশ বা প্রায় ১০ কোটি ১৮ লাখ মানুষের পুষ্টিকর খাদ্য কেনার সামর্থ্য ছিল না, ২০২৫ সালে তা কমে ৩৮.৬ শতাংশ বা প্রায় ৬ কোটি ৭৮ লাখে নেমে এসেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত কয়েক বছরে মানুষের খাদ্য ব্যয়ের জন্য বরাদ্দ আয় খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধির তুলনায় দ্রুত বেড়েছে, ফলে ক্রয়ক্ষমতায় কিছু উন্নতি এসেছে।

বিশ্বজুড়ে বেড়েছে স্বাস্থ্যকর খাদ্যের ব্যয়

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যকর খাদ্যের দৈনিক গড় ব্যয়ও বেড়েছে। ২০১৭ সালে যেখানে এ ব্যয় ছিল ২.৯৪ ডলার, ২০২১ সালে তা বেড়ে হয় ৩.৪৪ ডলার এবং ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ৪.২৮ ডলারে।

লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে এ ব্যয় সবচেয়ে বেশি, দৈনিক ৪.৯১ ডলার।

তবে ইতিবাচক দিক হলো, বিশ্বে স্বাস্থ্যকর খাবার কিনতে অক্ষম মানুষের সংখ্যা ২০১৭ সালের ২৯৭ কোটি (৩৭.৪ শতাংশ) থেকে ২০২৫ সালে কমে ২৬৯ কোটিতে (৩২.৭ শতাংশ) নেমে এসেছে।

করণীয় কী?

স্বাস্থ্যকর খাদ্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে প্রতিবেদনে কয়েকটি সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—

  • খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থা আরও দক্ষ ও সাশ্রয়ী করা।
  • উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় কমানো।
  • সংরক্ষণাগার ও প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রযুক্তির উন্নয়ন।
  • বাজারসংক্রান্ত তথ্যপ্রবাহ আধুনিক করা।
  • খাদ্যের অপচয় কমানো এবং সরবরাহ শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা।

প্রতিবেদনটি বলছে, এসব উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে স্বাস্থ্যকর খাদ্য আরও বেশি মানুষের নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হবে।