tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশফ্যামিলি কার্ডসহ ভাতা-চাকরির প্রলোভন, টাকা নেওয়ার অভিযোগ ‘সাংবাদিকের’ বিরুদ্ধে

ফ্যামিলি কার্ডসহ ভাতা-চাকরির প্রলোভন, টাকা নেওয়ার অভিযোগ ‘সাংবাদিকের’ বিরুদ্ধে

লক্ষ্মীপুরের কমলনগরে সরকারি কোনো কার্যক্রম শুরুর আগেই ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে অর্ধশতাধিক দরিদ্র ও অসহায় পরিবারের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মোসলেউদ্দিন নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়া এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, শিশুর জন্মনিবন্ধন এবং চাকরি দেওয়ার কথা বলেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়নের মুন্সিরহাট এলাকার বাসিন্দা মোসলেউদ্দিন দীর্ঘদিন ধরে নিজেকে সাংবাদিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে আসছেন। পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে—এমন পরিচয় ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে টাকা নিতেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

স্থানীয় মুন্সিরহাট বাজারের প্রবীণ সবজি বিক্রেতা আবু তাহের জানান, রাস্তাঘাট ও ডোবা থেকে কচুর লতি ও শাক সংগ্রহ করে বিক্রি করে অল্প অল্প করে জমানো টাকা তিনি মোসলেউদ্দিনকে দিয়েছিলেন। ফ্যামিলি কার্ড পেলে সরকার প্রতি মাসে অর্থ দেবে এবং ভবিষ্যতে আর্থিক কষ্ট থাকবে না—এমন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল তাকে।

আবু তাহেরের দাবি, কার্ড করে দেওয়ার জন্য ‘উপজেলার স্যারকে’ টাকা দিতে হবে জানিয়ে তার কাছ থেকে ২ হাজার ৭০০ টাকা নেন মোসলেউদ্দিন। পরে তিনি বুঝতে পারেন, ওই আশ্বাস দিয়ে তার সঙ্গে প্রতারণা করা হয়েছে।

একইভাবে স্থানীয় চা দোকানদার আবদুস সহীদের কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা, কহিনুর বেগমের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা, ফয়জুন্নেছার কাছ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং নুরনাহারের কাছ থেকেও ২ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। মেথর সেলিমের কাছ থেকেও ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা জানান।

শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছেন ষাটোর্ধ্ব অজুফা খাতুন। তিনি বলেন, অর্থাভাবে নিয়মিত ওষুধ কেনাও তার জন্য কঠিন। ফ্যামিলি কার্ড হলে প্রতি মাসে টাকা পাওয়া যাবে—এমন কথা বলে তার কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা নেওয়া হয়। এখন টাকা যেমন নেই, তেমনি কার্ডও পাননি এবং মোসলেউদ্দিনেরও দেখা মিলছে না বলে আক্ষেপ করেন তিনি।

ফ্যামিলি কার্ডের পাশাপাশি অন্যান্য সরকারি সুবিধা দেওয়ার নামেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। রহিমা আক্তারের কাছ থেকে তার ছেলের জন্মনিবন্ধন করে দেওয়ার কথা বলে ২ হাজার টাকা এবং জরিনা বেগমের কাছ থেকে বয়স্ক ভাতা দেওয়ার আশ্বাসে ৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চাকরি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতেও টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় পল্লিচিকিৎসক মো. বশির জানান, প্রায় এক বছর আগে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তার কাছ থেকে নগদ ২৫ হাজার টাকা নেন মোসলেউদ্দিন। পরে খোঁজ নিয়ে তিনি জানতে পারেন, তার মতো আরও অন্তত ২০ জন চাকরিপ্রত্যাশীর কাছ থেকেও একইভাবে টাকা নেওয়া হয়েছে।

বশিরের অভিযোগ, পাওনা টাকা ফেরত চাইলে মোসলেউদ্দিন তাকে উল্টো গালাগাল করেন এবং মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার হুমকি দেন।

স্থানীয় তারেক রহমান রকি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন ভাতার কথা বলে মোসলেউদ্দিনের টাকা নেওয়ার বিষয়টি এলাকায় অনেকেরই জানা। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ডের নামে প্রতারণা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর সম্প্রতি মুন্সিরহাট বাজারে ৩০ থেকে ৩৫ জন ভুক্তভোগী একত্র হয়ে মোসলেউদ্দিনকে অবরুদ্ধ করেন। এ সময় বাজারে উত্তেজনা ও হট্টগোল সৃষ্টি হলে স্থানীয় সাবেক মেম্বার নুরুল আমিনসহ কয়েকজন ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন। পরে ভুক্তভোগীদের নেওয়া টাকা ফেরত দেওয়ার শর্তে মোসলেউদ্দিনকে ছেড়ে দেওয়া হয় বলে জানা গেছে। এ ঘটনার একটি ভিডিও ক্লিপও যুগান্তরের হাতে এসেছে।

তবে মোসলেউদ্দিন তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতারণার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, এলাকার একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এসব কথা ছড়াচ্ছে। ফ্যামিলি কার্ড ও বিভিন্ন ভাতার নামে টাকা নেওয়ার অভিযোগে তাকে অবরুদ্ধ করার ভিডিও থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

কমলনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাহাত উজ-জামান জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে তার কার্যালয়ে ইতোমধ্যে আবু তাহের ও পারভীন আক্তার নামে দুজনের পৃথক লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।