tanaka
প্রচ্ছদরাজনীতিফখরুলের পর বিএনপি ও সরকারে রদবদলের আলোচনা, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে?

ফখরুলের পর বিএনপি ও সরকারে রদবদলের আলোচনা, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে?

মহাসচিব পদে নতুন মুখ, মন্ত্রিসভায় পরিবর্তন ও উপনির্বাচন ঘিরে বিএনপিতে বাড়ছে আলোচনা

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর বিএনপি ও সরকার—দুই ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য একাধিক পরিবর্তন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে। দলের মহাসচিব পদ থেকে ফখরুলের সরে দাঁড়ানো এবং তার হাতে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে সম্ভাব্য পরিবর্তনকে ঘিরে নতুন সমীকরণ তৈরি হয়েছে।

এরই মধ্যে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটিতে চারজন নতুন সদস্য যুক্ত হয়েছেন। তারা হলেন রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম। একই সময়ে মহাসচিব পদে নতুন নেতৃত্ব, মন্ত্রিসভায় সম্ভাব্য রদবদল এবং ফখরুলের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সম্ভাব্য উত্তরসূরি নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা তীব্র হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাষ্ট্রপতি হিসেবে ফখরুলের শপথের পর এসব পরিবর্তনের প্রক্রিয়া আরও স্পষ্ট হতে পারে। বিশেষ করে দলীয় মহাসচিব নির্বাচন, মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পুনর্বণ্টন এবং ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সম্ভাব্য উপনির্বাচনকে ঘিরে বিএনপিতে শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ।

স্থায়ী কমিটিতে চার নতুন মুখ

নতুন চার সদস্য যুক্ত হওয়ার পর বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ জনে। নতুন সদস্যদের মধ্যে রুহুল কবির রিজভী দীর্ঘদিন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

সাবেক সচিব মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসনবিষয়ক উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন। চিকিৎসক ফরহাদ হালিম জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক। অন্যদিকে ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি আমানউল্লাহ আমান বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

বর্তমান স্থায়ী কমিটিতে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, রফিকুল ইসলাম মিয়া, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, সেলিমা রহমান, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, এ জেড এম জাহিদ হোসেনসহ নতুন চার সদস্য।

এর মধ্যে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর মহাসচিবের পদসহ দলীয় পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য রফিকুল ইসলাম মিয়াও দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় রয়েছেন বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।

বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, চেয়ারম্যান, সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান ও মহাসচিব স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে গণ্য হন। তাদেরসহ জাতীয় স্থায়ী কমিটির নির্ধারিত সদস্যসংখ্যা ১৯ জন। ২০১৬ সালের ১৯ মার্চ সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে মৃত্যু, পদত্যাগসহ বিভিন্ন কারণে কয়েকটি পদ শূন্য হয়। এবার একসঙ্গে চারজনকে নতুন করে যুক্ত করা হয়েছে।

মহাসচিব পদে কারা আলোচনায়?

মির্জা ফখরুলের পদত্যাগের পর বিএনপির মহাসচিবের পদটি বর্তমানে শূন্য। নতুন মহাসচিব হিসেবে এখনো কোনো নাম আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।

তবে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে স্থায়ী কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার পর তাকে পরবর্তী কাউন্সিল পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে দলের ভেতরে আলোচনা চলছে। যদিও এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি বিএনপি।

মন্ত্রিসভায়ও পরিবর্তনের সম্ভাবনা

রাষ্ট্রপতি পদে ফখরুলের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ায় তার দায়িত্বে থাকা স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে নতুন মুখ আসার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সময়ে সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হওয়ায় মন্ত্রিসভার কার্যক্রম পর্যালোচনা করে সীমিত আকারে দায়িত্ব পুনর্বণ্টনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, রাষ্ট্রপতির শপথের আগে বড় ধরনের মন্ত্রিসভা পুনর্গঠনের সম্ভাবনা কম। তবে কয়েকজন নতুন মুখকে যুক্ত করে সীমিত পরিবর্তন আনা হতে পারে।

স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দিন চৌধুরীকে দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।

এ ছাড়া সম্ভাব্য নতুন মুখ হিসেবে কৃষক দলের সাধারণ সম্পাদক শহিদুল ইসলাম বাবুল, গাইবান্ধা-৪ আসনের সংসদ সদস্য শামীম কায়সার লিংকন, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান ও সেলিমা রহমান, ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, লুৎফুজ্জামান বাবর, যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের নামও আলোচনায় রয়েছে।

রাজনৈতিক মহলে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমানকে টেকনোক্র্যাট কোটায় মন্ত্রী করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। পাশাপাশি কয়েকজন প্রতিমন্ত্রীকে পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও গুঞ্জন রয়েছে। তবে এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে কে আসছেন?

রাষ্ট্রপতি হলে মির্জা ফখরুলের সংসদীয় আসন ঠাকুরগাঁও-১ শূন্য হবে। ফলে সেখানে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হতে পারে। এই আসনে সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে স্থানীয়ভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় রয়েছে ফখরুলের ছোট ভাই ও ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমিনের নাম।

এর পাশাপাশি ফখরুলের বড় মেয়ে মির্জা শামারুহর নামও স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনায় এসেছে। তবে সম্ভাব্য প্রার্থিতা নিয়ে মির্জা পরিবারের পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে উত্তরসূরি নির্বাচন শুধু একটি পরিবারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জেলার রাজনৈতিক ভারসাম্য ও সাংগঠনিক নেতৃত্বের প্রশ্নও জড়িত। একদিকে অভিজ্ঞ নেতৃত্বের মাধ্যমে তৃণমূলকে ধরে রাখার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, অন্যদিকে পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় তরুণ নেতৃত্ব সামনে আনার দাবিও রয়েছে।

ফলে মির্জা ফখরুলের রাষ্ট্রপতি পদে যাত্রার সঙ্গে সঙ্গে বিএনপি ও সরকারে সম্ভাব্য পরিবর্তনের পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও-১ আসনে নতুন নেতৃত্বের প্রশ্নটিও সামনে এসেছে। শেষ পর্যন্ত মহাসচিব পদ, মন্ত্রিসভা এবং ফখরুলের ছেড়ে দেওয়া আসনে কারা দায়িত্ব পাচ্ছেন—তা নির্ধারণে বিএনপির হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।