tanaka
প্রচ্ছদসারাদেশপোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে নাশকতার ছক, ডিবির তদন্তে সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ প্রভাবশালীদের...

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলন ঘিরে নাশকতার ছক, ডিবির তদন্তে সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপিসহ প্রভাবশালীদের নাম

পোশাকশ্রমিকদের আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশের তৈরি পোশাক খাত অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনার তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এ ঘটনায় সাবেক দুই অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক (অতিরিক্ত আইজিপি), আওয়ামী লীগ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্যসহ একটি প্রভাবশালী চক্রের নাম উঠে এসেছে বলে দাবি করেছে সংস্থাটি। ডিবির ভাষ্য অনুযায়ী, শ্রমিকদের স্বাভাবিক দাবিদাওয়াকে কাজে লাগিয়ে সহিংসতা উসকে দেওয়া, গুজব ছড়ানো এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

গত ৩ নভেম্বর রাজধানীর মিরপুরের কালশী-পূরবী মোড়ে ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানার সামনে ডিএমপির কনস্টেবল সালমানের ওপর হামলা ও সহিংসতার ঘটনায় গ্রেপ্তার ১৯ জনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এই পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক সামনে এসেছে। সিসিটিভি ফুটেজ এবং আসামিদের ব্যবহৃত ১৬টি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের বার্তা, অডিও ও ছবি বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা শনাক্তের চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছে ডিবি।

ডিবির দাবি, এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছেন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি ও আওয়ামী লীগ নেতা এস এম মান্নান কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, তাঁর ভাগিনা আলিফ মোল্লা এবং সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিক। তাঁদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের স্থানীয় পর্যায়ের কয়েকজন নেতা এবং সাবেক জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধেও আন্দোলনে অর্থায়ন ও উসকানি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

কারখানার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তদন্তে নতুন তথ্য

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, কালশীর ‘শিহা ডিজাইন বাংলাদেশ লিমিটেড’ কারখানাটি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচির মালিকানায় ছিল। পরে কাগজে-কলমে তিনি মালিকানা থেকে সরে দাঁড়ালেও কারখানাটির নিয়ন্ত্রণ পাঁচ সদস্যের একটি সিন্ডিকেটের হাতে যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

ওই সিন্ডিকেটে সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি আতিকুল ইসলাম ও আবু হাসান মুহম্মদ তারিকের নাম রয়েছে। অন্য সদস্যরা হলেন আতিকুল ইসলামের শ্যালক নুরুল ইসলাম, শফিকুল ইসলাম ও মুশতাক আহমেদ।

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার ও ডিবিপ্রধান শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতা কচি, সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা, তাঁর ভাগিনা আলিফ মোল্লা, সাবেক দুই অতিরিক্ত আইজিপি, মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের প্রচার সম্পাদক আক্তার রনি এবং ওই ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলরসহ বেশ কয়েকজন এই আন্দোলনে অর্থায়ন ও নেপথ্যে থেকে ইন্ধন জুগিয়েছেন বলে তথ্য পাওয়া গেছে।

তিনি বলেন, শ্রমিকদের আন্দোলনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পুরো তৈরি পোশাক খাত অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা ছিল। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সহিংসতার নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী ও অর্থদাতাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান চলছে।

১৬টি গোপন গ্রুপে নাশকতার পরিকল্পনার অভিযোগ

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন জব্দ করে অন্তত ১৬টি হোয়াটসঅ্যাপ ও মেসেঞ্জার গ্রুপের সন্ধান পাওয়া গেছে। ‘চেতনা মুক্তিযুদ্ধ’, ‘শেখ হাসিনা রিজার্ভ ফোর্স’, ‘ঢাকা জেলা গেরিলা ৭১’, ‘হাসু আপার বাংলা’, ‘শেখ হাসিনার প্রত্যাবর্তন’ ও ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ গেরিলা’সহ বিভিন্ন নামে এসব গ্রুপ পরিচালিত হতো বলে দাবি তদন্তকারীদের।

তাঁদের ভাষ্য, এসব গ্রুপে ছদ্মনামে যোগাযোগ করে বিভিন্ন কর্মসূচি ও নাশকতার পরিকল্পনা আদান-প্রদান করা হতো। আলামত মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে বেশ কিছু বার্তা মুছে ফেলা হলেও ডিবির ফরেনসিক দল অডিও ও ছবি উদ্ধার করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

তদন্তে আরও উঠে এসেছে, মিছিল ও সহিংসতার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো হলে সেগুলো দেখে অর্থ পাঠানোর ব্যবস্থা করতেন ইলিয়াস মোল্লার ভাগিনা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লা—এমন অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত ১ নভেম্বর পল্লবীতে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেওয়ার ভিডিও ধারণ করে তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পাঠান কক্সবাজারের যুবলীগ নেতা মুয়াজ্জেম শাহরিয়ার নেওয়াজ বলে তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।

বিভিন্ন জেলা থেকে লোক এনে গুজব ছড়ানোর অভিযোগ

ডিবির তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি, পোশাকশ্রমিকদের বেতন ও অন্যান্য দাবি-দাওয়াকে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে কাজে লাগাতে পঞ্চগড়, কক্সবাজার ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন ঢাকায় জড়ো করা হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে পঞ্চগড় কলেজ ছাত্রলীগের নেতা নাহিদ হাসানের নামও এসেছে।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার রনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গাজীপুরে দুই পোশাকশ্রমিকের লাশ পাওয়ার খবর প্রচার করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের ভাষ্য, এই তথ্য ছিল ভিত্তিহীন। এমন গুজব ছড়িয়ে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে তাঁদের রাজপথে নামানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।

কনস্টেবল সালমানের ওপর হামলায় গ্রেপ্তার আট

গত ৩ নভেম্বর রাজধানীর কালশী মোড়ে ডিএমপি কনস্টেবল সালমানকে ঘিরে ধরে মারধর করা হয়। হামলার ঘটনায় বিভিন্ন স্থানের চার-পাঁচটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগে আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে ডিবি।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন আশিক জুলহাস, আরাফাত ইসলাম জিসান, মো. রশিদ আলী, সোহেল রানা, মিলন বাবু, আনারুল ইসলাম, মো. রানা ও মনছুর আলী। এর আগে ১ নভেম্বর গ্রেপ্তার হওয়া আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের ১১ নেতাকর্মীকে তিন দিনের রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

ডিবির সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ নেতা আলিফ মোল্লা ও জুয়েল মোল্লার সরাসরি যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য বিশ্লেষণ করে অর্থ লেনদেনের একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান মিলেছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ফোনে নির্দেশনা দিয়ে লোক জড়ো করার তথ্য

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, মাঠপর্যায়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভয়েস মেসেজভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহার করতেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে আসা অডিও বার্তা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দূর থেকে ফোনে নির্দেশনা দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে লোকজনকে জড়ো করা হতো।

এমন একটি অডিও বার্তায় গ্রেপ্তার নাহিদকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনারা সবাই ১২ নম্বর ইলিয়াস মোল্লার মার্কেটের সামনে আসেন… এখানে পুলিশ একদিকে চলে গেছে, আমাদের সুযোগ নিতে হবে… আজকের দিনটা করতে পারলে আমাদের নাম হবে।’

ডিবির দাবি, উদ্ধার করা ডিজিটাল আলামত, সিসিটিভি ফুটেজ ও গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সহিংসতার পরিকল্পনা, অর্থায়ন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা হচ্ছে। এ ঘটনায় যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্তের ফল এবং আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।