tanaka
প্রচ্ছদলাইফস্টাইলপেটের চর্বি কি কমিয়ে দিচ্ছে পুরুষের টেস্টোস্টেরন ও যৌনক্ষমতা?

পেটের চর্বি কি কমিয়ে দিচ্ছে পুরুষের টেস্টোস্টেরন ও যৌনক্ষমতা?

বয়স বাড়লেই পুরুষের যৌনস্বাস্থ্য দুর্বল হবে, এমন ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। নতুন এক গবেষণা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বয়সের পাশাপাশি পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বির সঙ্গে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু ভুঁড়ি থাকলেই যৌনক্ষমতা কমে যায়—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

পেটের মেদ বা ভুঁড়িকে অনেক সময় স্বচ্ছলতার প্রতীক হিসেবে মজা করে দেখা হয়। কিন্তু পেটের ভেতরে অতিরিক্ত চর্বি জমা স্বাস্থ্যের জন্য নানা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে পুরুষের হরমোনের ভারসাম্য ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের ওপর এর প্রভাব নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

জার্নাল অব দ্য এন্ডোক্রাইন সোসাইটি–তে প্রকাশিত একটি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমার সঙ্গে বয়সের সম্পর্ক থাকলেও শরীরে চর্বি জমার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বি বা ভিসেরাল ফ্যাটের সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রার সম্পর্ক গবেষকদের নজরে এসেছে।

সাধারণত বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষের টেস্টোস্টেরনের মাত্রা ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে এই পরিবর্তনের জন্য বয়সই একমাত্র দায়ী নয়। শরীরের অতিরিক্ত চর্বি, স্থূলতা, বিপাকীয় সমস্যা এবং সামগ্রিক স্বাস্থ্যের অবস্থাও হরমোনের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।

পেটের গভীরে জমা চর্বি কেন উদ্বেগের?

ভিসেরাল ফ্যাট বা অন্তঃপেটীয় চর্বি হলো পেটের ভেতরে লিভার, পাকস্থলী ও অন্ত্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের চারপাশে জমে থাকা চর্বি। ত্বকের নিচে জমা চর্বির তুলনায় এই চর্বি শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত।

গবেষকদের বিশ্লেষণে যুক্তরাষ্ট্রের ২০ থেকে ৫৯ বছর বয়সি প্রায় পাঁচ হাজার পুরুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিবেচনা করা হয়। এতে পেটের গভীরে জমে থাকা চর্বির সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমে যাওয়ার উল্লেখযোগ্য সম্পর্ক পাওয়া যায়। বিশ্লেষণে বয়সের তুলনায় ভিসেরাল ফ্যাটের সঙ্গে হরমোনের মাত্রার সম্পর্ক আরও স্পষ্ট ছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

পর্যালোচনার লেখক কার্ল ফ্রিডল ও অ্যাডাম পটারের মতে, পুরুষের টেস্টোস্টেরন কম থাকার সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়গুলো মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ভিসেরাল ফ্যাটকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

তবে গবেষণায় কোনো দুটি বিষয়ের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া মানেই একটি বিষয় সরাসরি অন্যটির কারণ—এমন নয়। এ ক্ষেত্রে পেটের চর্বি ও টেস্টোস্টেরনের মাত্রার পারস্পরিক সম্পর্ক আরও ভালোভাবে বুঝতে অতিরিক্ত গবেষণা প্রয়োজন।

আগের গবেষণাগুলো কী বলছে?

শরীরের অতিরিক্ত চর্বি এবং টেস্টোস্টেরনের মাত্রার মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে আগেও গবেষণা হয়েছে।

২০০৭ সালে ১ হাজার ৬৬৭ জন পুরুষের ওপর পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বডি মাস ইনডেক্স (বিএমআই) চার থেকে পাঁচ পয়েন্ট বাড়ার সঙ্গে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার সম্পর্ক রয়েছে। গবেষণাটিতে এই পরিবর্তনকে প্রায় ১০ বছর বয়স বাড়ার সঙ্গে সম্পর্কিত প্রভাবের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল।

২০১৩ সালের আরেকটি গবেষণায় ১ হাজার ৩৮২ জন পুরুষকে পাঁচ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কমার সঙ্গে বয়সের পাশাপাশি ধূমপান, স্থূলতা, বিষণ্নতা ও সামগ্রিক স্বাস্থ্যের সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এসব গবেষণার ফলাফল থেকে বোঝা যায়, পুরুষের হরমোনের মাত্রা শুধু বয়সের ওপর নির্ভর করে না। জীবনযাপন, শারীরিক গঠন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যের মতো বিষয়ও এতে ভূমিকা রাখতে পারে।

শুধু ওজন বা বিএমআই দিয়ে কি ঝুঁকি বোঝা সম্ভব?

শরীরের ওজন, বিএমআই এবং কোমরের মাপ স্থূলতা মূল্যায়নে সহায়ক। তবে এসব মাপ দিয়ে শরীরের ভেতরে ঠিক কোথায় কতটা চর্বি জমেছে, তা সব সময় নির্ভুলভাবে বোঝা যায় না।

একই বিএমআই বা প্রায় একই কোমরের মাপ থাকা দুই ব্যক্তির শরীরে ভিসেরাল ফ্যাটের পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। ফলে তাঁদের বিপাকীয় স্বাস্থ্য ও হরমোনের মাত্রাও আলাদা হতে পারে।

আবার পেশিবহুল কোনো ব্যক্তির বিএমআই বেশি হলেও তাঁর শরীরে অতিরিক্ত চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকতে পারে। অন্যদিকে, ওজন স্বাভাবিক সীমায় থাকা ব্যক্তির পেটের গভীরেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ চর্বি জমতে পারে।

এ কারণে হরমোনের স্বাস্থ্য মূল্যায়নের সময় শুধু বয়স বা ওজনের ওপর নির্ভর না করে কোমরের মাপ, বিপাকীয় ঝুঁকি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে অন্যান্য পরীক্ষার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।

পেটের চর্বি কীভাবে টেস্টোস্টেরনকে প্রভাবিত করতে পারে?

ভিসেরাল ফ্যাট ও টেস্টোস্টেরনের মধ্যকার সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার নয়। তবে কয়েকটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা রয়েছে।

ইনসুলিন প্রতিরোধ: পেটের অতিরিক্ত চর্বি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা ইনসুলিন প্রতিরোধের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এতে শরীরের বিপাকীয় কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং হরমোন উৎপাদন ও নিয়ন্ত্রণের প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে।

প্রদাহজনিত প্রক্রিয়া: ভিসেরাল ফ্যাট শরীরে দীর্ঘমেয়াদি নিম্নমাত্রার প্রদাহের সঙ্গে সম্পর্কিত। এ ধরনের প্রদাহ হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে।

হরমোনের রূপান্তর: শরীরের চর্বিতে টেস্টোস্টেরন থেকে ইস্ট্রাডিওল তৈরির প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখা এনজাইম থাকে। অতিরিক্ত চর্বি এই হরমোনের ভারসাম্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

এসব প্রক্রিয়া টেস্টোস্টেরনের মাত্রার পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রে ঠিক কোন কারণটি কতটা প্রভাব ফেলছে, তা কেবল পেটের মেদ দেখে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

টেস্টোস্টেরন কমলে কি যৌনক্ষমতাও কমে যায়?

টেস্টোস্টেরন পুরুষের যৌন আকাঙ্ক্ষা, প্রজননস্বাস্থ্য, পেশির গঠন, হাড়ের স্বাস্থ্য এবং শরীরের বিভিন্ন স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হরমোনটির মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে কমে গেলে কারও কারও যৌন আকাঙ্ক্ষা কমে যাওয়া, সকালের স্বাভাবিক উত্থান কমে যাওয়া, ক্লান্তি বা পেশির শক্তি হ্রাসের মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।

তবে যৌনক্ষমতা একটি বহুমাত্রিক বিষয়। যৌন আকাঙ্ক্ষা, উত্থানজনিত সমস্যা ও প্রজননক্ষমতা এক বিষয় নয়। এসবের ওপর ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তনালির সমস্যা, কিছু ওষুধ, মানসিক চাপ, ঘুমের ঘাটতি এবং সম্পর্কজনিত বিষয়ও প্রভাব ফেলতে পারে।

তাই পেটে চর্বি আছে বলেই কারও টেস্টোস্টেরন কমে গেছে কিংবা যৌনক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

পেটের চর্বি কমাতে কী করবেন?

পেটের অতিরিক্ত চর্বি কমানো এবং সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্য ভালো রাখতে জীবনযাপনে কিছু পরিবর্তন সহায়ক হতে পারে।

  • সুষম খাবার খান: শাকসবজি, ফল, ডাল, পূর্ণশস্য ও পর্যাপ্ত প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নিন। অতিরিক্ত চিনি, মিষ্টি পানীয় ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার কমান।
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করুন: দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো বা অন্যান্য অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি উপযোগী শক্তিবর্ধক ব্যায়াম করুন।
  • পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন: নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস বজায় রাখুন। দীর্ঘদিন ঘুমের ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
  • ওজন ও কোমরের মাপ পর্যবেক্ষণ করুন: প্রয়োজন হলে ধীরে ধীরে ওজন কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করুন। শুধু পেটের ব্যায়াম করে নির্দিষ্ট স্থানের চর্বি আলাদাভাবে কমানো যায় না।
  • ধূমপান ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ন্ত্রণ করুন: ধূমপান এড়িয়ে চলুন এবং ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা থাকলে যথাযথ চিকিৎসা নিন।

ওজন কমানোর ওষুধ কিংবা টেস্টোস্টেরন বাড়ানোর কোনো চিকিৎসা নিজে থেকে শুরু করা উচিত নয়। এসব চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা, উপকারিতা ও ঝুঁকি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?

যৌন আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিন কম থাকা, উত্থানজনিত সমস্যা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা পেশির শক্তি কমে যাওয়ার মতো উপসর্গ থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো। প্রয়োজন হলে চিকিৎসক উপসর্গের ইতিহাস ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে সকালে টেস্টোস্টেরন পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করতে পারেন। হরমোনের ঘাটতি নির্ণয়ে সাধারণত শুধু একটি পরীক্ষার ফল নয়, উপসর্গ ও পুনরায় পরীক্ষার ফলও বিবেচনা করা হয়।

টেস্টোস্টেরন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি সবার জন্য প্রয়োজনীয় নয়। বিশেষ করে ভবিষ্যতে সন্তান নেওয়ার পরিকল্পনা থাকলে এ ধরনের চিকিৎসা শুরু করার আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ জরুরি, কারণ বাইরের উৎস থেকে টেস্টোস্টেরন গ্রহণ শুক্রাণু উৎপাদন কমিয়ে দিতে পারে।

সবশেষে, পেটের অতিরিক্ত চর্বি শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যের বিষয় নয়; এটি বিপাকীয় ও হরমোনের স্বাস্থ্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত। তবে ভুঁড়ি থাকলেই যৌনক্ষমতা কমে যাবে, এমন নয়। স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, উপসর্গের প্রতি সচেতনতা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শই সুস্থ থাকার সবচেয়ে কার্যকর পথ।