tanaka
প্রচ্ছদঅন্যান্যপিংক বাসে উঠে যা দেখলাম, যাত্রী-চালকের অভিজ্ঞতায় উঠে এলো নানা চ্যালেঞ্জ

পিংক বাসে উঠে যা দেখলাম, যাত্রী-চালকের অভিজ্ঞতায় উঠে এলো নানা চ্যালেঞ্জ

নারীদের জন্য চালু হওয়া ‘পিংক বাসে’ চড়ার ইচ্ছা ছিল ১৯ আগস্টই। কিন্তু বাসটির নির্ভরযোগ্য সময়সূচি না জানায় সেদিন মোহাম্মদপুর বাস ডিপোয় প্রায় ৪৫ মিনিট অপেক্ষা করেও কোনো নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পরে দুপুর আড়াইটার দিকে এক টিকিট বিক্রেতার কাছ থেকে জানা যায়, বাসটি সকাল সোয়া ৮টায় মোহাম্মদপুর থেকে ছেড়ে গেছে।

জানা যায়, মতিঝিল থেকে বাসটি মোহাম্মদপুরের দিকে ফিরবে বিকেল ৩টা অথবা ৫টার দিকে। তখনই মনে হয়েছিল, যাত্রীদের জন্য নির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য সময়সূচি থাকলে এমন ভোগান্তি এড়ানো সম্ভব।

দ্বিতীয় দিনের অভিজ্ঞতা

পরদিন, ২০ আগস্ট সকালেই সোয়া ৮টার বাস ধরতে মোহাম্মদপুর ডিপোয় পৌঁছাই। গিয়ে দেখা গেল, ডিপোর ভেতরে পিংক বাসটি দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু বাসে তখন কোনো চালক বা যাত্রী নেই। আগের দিনের মতোই বাসটি কখন ছাড়বে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দিতে পারলেন না কেউ।

সকাল ৮টার দিকে ডিপোয় পৌঁছে অপেক্ষা করতে থাকি। প্রায় সাড়ে ৮টার দিকে চালকদের দেখা মেলে। তাঁদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, আগের দিনের সড়কযাত্রার অভিজ্ঞতা খুব একটা স্বস্তিদায়ক ছিল না। সেই অভিজ্ঞতার মধ্যেই তাঁরা নতুন দিনের যাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

বাসটি ডিপোর কিছুটা সামনে আনা হলে একে একে নারী যাত্রীরা উঠতে শুরু করেন। বেশ কয়েকজন গণমাধ্যমকর্মীও তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। বাসে উঠে দেখা গেল, বেশ কিছু আসন তখনো খালি।

যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগের দিন মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিল পৌঁছাতে বাসটির নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় লেগেছিল। ফলে দ্বিতীয় দিন অনেক নারী যাত্রী বাসটির জন্য অপেক্ষা না করে বিকল্প পরিবহন বেছে নিয়েছেন বলে জানান মার্কেন্টাইল ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের অ্যাকাউন্টস অফিসার ফারহানা হাবীব।

শুরু হলো মতিঝিলের পথে

সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে বাসটি মোহাম্মদপুর থেকে মতিঝিলের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। নির্ধারিত রুট ছিল শংকর, ধানমন্ডি ১৫, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, টিএসসি, সচিবালয় হয়ে মতিঝিল।

বাস চলতে শুরু করতেই গণমাধ্যমকর্মীরা যাত্রীদের সাক্ষাৎকার ও ভিডিও ধারণ শুরু করেন। কেউ কেউ নারী চালকের গাড়ি চালানোর দৃশ্য ধারণের জন্য চালকের সামনে পর্যন্ত চলে যাচ্ছিলেন।

এতে বাসের যাত্রীদের মধ্যে বিরক্তি দেখা দেয়। একপর্যায়ে তাঁরা প্রতিবাদ করেন। যাত্রীদের অভিযোগ, আগের দিনও এভাবে ভিডিও ধারণের কারণে চালকের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটেছিল।

চালকের জন্যও নতুন অভিজ্ঞতা

শংকরের কাছাকাছি ছায়ানট ভবনের সামনে কয়েকজন নারী যাত্রী হাত ইশারা করে বাস থামানোর চেষ্টা করেন। তবে নতুন রুট ও বড় সড়কে বাস চালানোর ক্ষেত্রে চালক নিজেও এখনো অভিজ্ঞ হয়ে ওঠেননি।

আগে বড় রাস্তায় ডাবল ডেকার বাস চালানোর অভিজ্ঞতা না থাকায় তাঁকে বেশ সতর্কতার সঙ্গে গাড়ি চালাতে দেখা যায়। অনেক সময় ডিভাইডারের কাছাকাছি দিয়ে বাস চালাচ্ছিলেন তিনি। কোন কোন স্থানে যাত্রী ওঠানামা করবেন, সে বিষয়েও পুরোপুরি অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেননি।

ফলে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্টপেজে যাত্রী ওঠানোর জন্য বাস না থামায় অপেক্ষমাণ কয়েকজনকে দৌড়ে বাসের কাছে গিয়ে উঠতে দেখা যায়।

পুরোনো রুট, নতুন চালক

বাসের এক যাত্রী সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রিন্সিপাল অফিসার শারমীন জাহান জানান, তিনি ২০১৫ সাল থেকেই মোহাম্মদপুর-মতিঝিল রুটে নিয়মিত যাতায়াত করেন।

তাঁর কাছ থেকে জানা যায়, এই রুটে বাস চলাচল নতুন নয়। ২০১৫ সাল থেকেই এই রুটে বাস চলছে; নতুনত্ব হলো, এবার চালকের আসনে বসেছেন নারীরা।

রাস্তায় নানা ধরনের চ্যালেঞ্জ

জিগাতলা ও সায়েন্স ল্যাবের দিকে যেতে যেতে বাসটির প্রতি পথচারীদের কৌতূহল চোখে পড়ে। অনেকেই মুঠোফোনে ছবি তুলছিলেন, কেউ কেউ ভিডিও করছিলেন। নারী চালক ও নারী যাত্রীদের নিয়ে চলা বাসটি পথচারীদের কাছে আলাদা আকর্ষণের বিষয় হয়ে উঠেছিল।

বাসের সহচালক লুৎফর নাহার জানান, সড়কে চলাচলের অভিজ্ঞতা সবসময় স্বস্তিদায়ক ছিল না। নারী চালক হওয়ায় অনেক অটোরিকশা ও সিএনজিচালক পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় প্রয়োজনীয় জায়গা দিতে চাইছিলেন না। এমনকি বিভিন্ন ধরনের আপত্তিকর মন্তব্যও শুনতে হয়েছে তাঁদের।

চালক ও যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, নতুন এই সেবায় উভয় পক্ষকেই নানা ধরনের বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

সম্ভাবনা আছে, দরকার আরও প্রস্তুতি

একজন নারী হিসেবে ব্যস্ত সড়কে বড় বাস চালানো যেমন চ্যালেঞ্জের, তেমনি নারী যাত্রীদের জন্য নির্ভরযোগ্য, সময়নিষ্ঠ ও স্বস্তিদায়ক গণপরিবহন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

পিংক বাস চালুর উদ্যোগটি ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। তবে এই সেবাকে আরও কার্যকর করতে নির্দিষ্ট সময়সূচি, স্পষ্ট স্টপেজ, চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, যাত্রী ওঠানামার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রথম কয়েক দিনের অভিজ্ঞতা বলছে, উদ্যোগটি সম্ভাবনাময়। এখন প্রয়োজন ব্যবস্থাপনাগত ঘাটতিগুলো দ্রুত দূর করে পিংক বাসকে নারীদের জন্য সত্যিকারের নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন হিসেবে গড়ে তোলা।