গাজীপুরের কাপাসিয়ার মাসুম মোল্লা নরসিংদীর পলাশে একটি ওয়ার্কশপে কাজ করতেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে পরিচয় হয় মুন্সীগঞ্জের মোজাম্মেলের। পলাশে মোজাম্মেলের শ্বশুরবাড়ি। একপর্যায়ে মোজাম্মেল মাসুমকে জানান, চাইলে তিনি ইতালি যেতে পারেন। তাঁর কথায় আগ্রহী হয়ে ওঠেন মাসুম। পরে রাজধানীর গুলশান এলাকার হাওলাদার ট্রাভেলসের মালিক মুন্না হাওলাদারের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ করিয়ে দেন মোজাম্মেল।
মুন্নার সঙ্গে মাসুমের ১৪ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। কথা ছিল, দুবাই হয়ে তাঁকে ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে। কিন্তু যাত্রাপথে মাসুমকে দুবাই থেকে পাঠিয়ে দেওয়া হয় লিবিয়ায়। সেখানে তাঁকে জিম্মি করে নির্যাতন চালানো হয়। পরে সেই নির্যাতনের ভিডিও ধারণ করে বাংলাদেশে তাঁর পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ৪০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করা হয়।
মাসুম মোল্লার মতো বিদেশ যেতে আগ্রহী যুবকদের দেশজুড়ে খুঁজে বের করে একটি সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র। ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে তাঁদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হয়। এরপর পরিবারের কাছ থেকে আদায় করা হয় লাখ লাখ টাকা। ডেনমার্কের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও জার্মানির ‘রবার্ট বোশ স্টিফটুং’ ফাউন্ডেশনের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‘মিক্সড মাইগ্রেশন সেন্টার (এমএমসি)’-এর এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া পর্যন্ত মানবপাচারের এই নেটওয়ার্ক অন্তত পাঁচটি স্তরে সক্রিয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাচারকারী চক্র কোনো একক ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর মাধ্যমে পরিচালিত হয় না। এটি একটি বহুস্তরীয় নেটওয়ার্ক, যার প্রতিটি স্তরের আলাদা দায়িত্ব রয়েছে।
প্রথম স্তরে রয়েছে স্থানীয় দালালরা। গ্রামের পরিচিত ব্যক্তি, আত্মীয় কিংবা পাড়া-মহল্লার পরিচিত মুখ হিসেবে তারা যুবকদের টার্গেট করে। চায়ের দোকান, মসজিদ কিংবা সামাজিক অনুষ্ঠানে নানা কৌশলে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলে। পরে বিদেশে গিয়ে সফলতার গল্প শুনিয়ে বিশ্বাস অর্জন করে পাসপোর্ট ও টাকা সংগ্রহ করে।
দ্বিতীয় স্তরে রয়েছে ট্রানজিট দালালরা। দুবাই, মিসর বা তুরস্কে অবস্থান করা এসব দালালের কাজ হলো বিমানবন্দর থেকে অভিবাসীদের গ্রহণ করা এবং ভুয়া কিংবা বৈধ ভিজিট ভিসার মাধ্যমে তাঁদের লিবিয়াগামী ফ্লাইটে তুলে দেওয়া।
তৃতীয় স্তরে রয়েছে লিবিয়ার বেনগাজি ও ত্রিপোলি বিমানবন্দরে সক্রিয় কিছু বাংলাদেশি দালাল। তারা স্থানীয় সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয় করে অভিবাসীদের ‘সেফ হাউস’ বা ‘গেম হাউসে’ আটকে রাখতে সহায়তা করে।
চতুর্থ স্তরে রয়েছে লিবিয়ার ‘গেম অপারেটররা’। উপকূলীয় এলাকা থেকে নৌকা ছাড়ার চূড়ান্ত ব্যবস্থাপনা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকে। অভিবাসীদের সঙ্গে তারা প্রায়ই নিষ্ঠুর আচরণ করে।
পঞ্চম স্তরে রয়েছে ইতালিতে অবস্থান করা পাচারকারী চক্রের সদস্যরা। তাঁরা অভিবাসীদের ফোন করে আশ্বস্ত করেন যে, ‘সব ঠিক আছে’। পরিবারের কাছ থেকে টাকা এনে দালালদের দিলে দ্রুত ইতালি পৌঁছে দেওয়া হবে—এমন আশ্বাস দিয়ে তাঁরা ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারকে চাপের মধ্যে রাখেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পাচারকারী চক্র সাধারণত গ্রামের পরিচিত বড় ভাই, আত্মীয়স্বজন কিংবা স্থানীয় দালালের মাধ্যমে বিদেশ যেতে আগ্রহীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। পাশাপাশি ফেসবুকের বিভিন্ন পেজ ও গ্রুপে ‘ইতালি যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ’ ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। যোগাযোগের জন্য ব্যবহার করা হয় ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপ। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ লাইসেন্সধারী কিছু এজেন্সিও গোপনে এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে।
এই পাচারকারী নেটওয়ার্ক অত্যন্ত সংগঠিত। কোনো একটি রুট বন্ধ হয়ে গেলে তারা দ্রুত বিকল্প পথ ব্যবহার করে। ভারত বা শ্রীলঙ্কা হয়ে অন্য রুটেও অভিবাসীদের পাঠানোর চেষ্টা করা হয়। পাচারকারীদের কাছে ভুক্তভোগীদের পরিবারই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য। কারণ, জিম্মি ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য পরিবারের সদস্যরা যেকোনো উপায়ে অর্থ সংগ্রহ করতে বাধ্য হন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্দিষ্ট সময়ে ইতালি সরকার কৃষি বা পর্যটন খাতে শ্রমিক নেওয়ার ঘোষণা দিলে পাচারকারীরা সেই সুযোগ কাজে লাগায়। ভুয়া নিয়োগপত্র দেখিয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেয় তারা। এসব প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে মনে করেন, তাঁরা বৈধ প্রক্রিয়ায় ইতালি যাচ্ছেন। এই জালিয়াতির কারণে ইতালিতে বাংলাদেশি নাগরিকদের রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনও বাড়ছে। ২০২৩ সালে যেখানে এ ধরনের আবেদন ছিল ২৩ হাজার ৪৪৮টি, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৩ হাজার ৩৯০টিতে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসনের পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট। দেশে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকায় অনেক যুবক উন্নত জীবনের আশায় বিদেশমুখী হচ্ছেন। জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেয়ে তাঁরা বিকল্প পথ খুঁজছেন। আগে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো জনপ্রিয় গন্তব্য হলেও, সেখানে মজুরি কমে যাওয়া ও কঠিন কর্মপরিবেশের কারণে অনেকে এখন ইউরোপের দিকে ঝুঁকছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে কাজ করা কিছু দালাল জিজ্ঞাসাবাদে দাবি করেছে, আত্মীয়স্বজনের উপকার করতে গিয়ে তারা এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। তবে যাঁদের ইতালি পাঠানোর কথা বলা হয়েছিল, তাঁদের লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করা হবে—এ বিষয়ে তারা জানত না বলে দাবি করেছে।
এদিকে সম্প্রতি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর থানায় একটি মানবপাচার মামলা হয়েছে। মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, ইতালি পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে কামরুজ্জামান নামের এক যুবককে লিবিয়ায় পাচার করে ১৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। সেখানে তাঁকে আটকে রেখে অমানবিক নির্যাতনও চালানো হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর ভাই মো. নুরুজ্জামান হোসেন বাদী হয়ে সুনামগঞ্জের মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালে পিটিশন মামলা করেন। পরে সেটি মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে নিয়মিত মামলা হিসেবে জগন্নাথপুর থানায় রুজু হয়।
মামলার এজাহার অনুযায়ী, জগন্নাথপুর উপজেলার মুজাহিদপুর গ্রামের কামরুজ্জামানকে ইতালি পাঠানোর কথা বলে ১৫ লাখ টাকা নেয় পাচারকারী চক্র। মামলায় চক্রের প্রধান হিসেবে সিলেট মহানগরের জালালাবাদ থানার হাওলাদারপাড়া এলাকার বাসিন্দা শিপন আহমদ এবং দিরাই উপজেলার ফজলুর রহমানসহ অজ্ঞাতপরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
বাদীর অভিযোগ, ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে এক মাসের মধ্যে কামরুজ্জামানকে ইতালি পাঠানোর কথা থাকলেও তাঁকে মিসর হয়ে লিবিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একটি অজ্ঞাত স্থানে আটকে রেখে তাঁর ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। পরে দেশে ফিরে টাকা ফেরত চাইলে মামলা তুলে নিতে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এদিকে মামলা হওয়ার পরও জগন্নাথপুর থানা পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখছে না বলে সুনামগঞ্জের পুলিশ সুপারের কাছে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীর পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের দাবি, আসামিরা প্রকাশ্যে ঘোরাফেরা করলেও পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করছে না। এ কারণে মামলাটি জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)তে হস্তান্তরের জন্য লিখিত আবেদনও করা হয়েছে।
এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের সহকারী পুলিশ সুপার (জগন্নাথপুর সার্কেল) মো. রফিকুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মামলার বাদী মামলাটি ডিবিতে স্থানান্তরের জন্য আবেদন করেছেন। মামলাটি ডিবিতে গেলে তারা তদন্ত করবেন।’



