ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে গাদি আইজেনকোটসহ কয়েকজন নেতাকে নিয়ে ঐক্য সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির। এমন সরকার ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করতে পারবে না, বরং দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। একসময় নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত এই উগ্র ডানপন্থি নেতা এখন পরবর্তী সরকার গঠন ও মন্ত্রিসভায় নিজের অবস্থান নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মতবিরোধে জড়িয়েছেন।
জেরুজালেম পোস্টকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বেন-গভির বলেন, নেতানিয়াহু আইজেনকোট ও অন্য কয়েকজন নেতাকে নিয়ে ঐক্য সরকার গঠনের পরিকল্পনা করছেন। তার মতে, এমন উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে, কিন্তু ইসরাইলের বাস্তব কোনো লাভ হবে না। উল্টো এ ধরনের সরকার দেশের ক্ষতি করতে পারে।
পরবর্তী সরকারে নিজের অবস্থান নিয়ে নেতানিয়াহুর সঙ্গে বেন-গভিরের বিরোধ সম্প্রতি আরও প্রকাশ্য হয়েছে। রোববার তিনি অভিযোগ করেন, নেতানিয়াহু ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে পরবর্তী মন্ত্রিসভায় তাকে রাখা হবে না। তবে নেতানিয়াহুর দল লিকুদ এ অভিযোগ নাকচ করেছে। এ ছাড়া নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে জানিয়েছেন, বেন-গভিরকে প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হবে না। যদিও জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরেই এই পদে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করছেন।
বেন-গভিরের নেতৃত্বাধীন উগ্র ডানপন্থি দল ওতজমা ইয়েহুদিত বর্তমান নেতানিয়াহু সরকারের গুরুত্বপূর্ণ শরিক। সাম্প্রতিক জনমত জরিপ অনুযায়ী, পরবর্তী নেসেট নির্বাচনে দলটি প্রায় আটটি আসন পেতে পারে।
ডানপন্থিদের নিয়েই সরকার গঠনের পক্ষে বেন-গভির
ইসরাইলে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখতে দুই বিপরীত রাজনৈতিক পক্ষকে নিয়ে সরকার গঠনের ধারণা প্রত্যাখ্যান করেছেন বেন-গভির। তিনি এমন একটি সরকার চান, যেটি স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে।
তার ভাষায়, সরকারকে দুই পক্ষের মধ্যে সমানভাবে বিভক্ত করে রাখা উচিত নয়। তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ ডানপন্থি সরকার গঠনের পক্ষে।
তবে সাম্প্রতিক অধিকাংশ জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, আগামী ২৭ অক্টোবরের নির্বাচনে নেতানিয়াহুর জোট কিংবা বিরোধী পক্ষ—কেউই এককভাবে নেসেটের ৬১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারছে না।
এই পরিস্থিতিতেও নতুন করে ডানপন্থি সরকার গঠনের বিষয়ে আশাবাদী বেন-গভির। তার বিশ্বাস, নির্বাচনের দিন নিজেদের সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি বাড়াতে পারলে নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারবে।
তিনি বলেন, সরকার গঠনের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে সমর্থকদের সবাইকে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে মতবিরোধ থাকলেও পরবর্তী সরকারে তাকেই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখতে চান বেন-গভির। আইজেনকোটের সঙ্গে সমঝোতার পরিবর্তে নেতানিয়াহুকে ডানপন্থিদের পাশে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বেন-গভির বলেন, নেতানিয়াহুর প্রতি তার ভালোবাসা রয়েছে এবং তিনি চান না আইজেনকোট ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী হোন। তার মতে, দেশের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ রক্ষায় নেতানিয়াহুর উচিত ডানপন্থিদের নিয়ে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়া।
আরব দল ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে জোটে আপত্তি
সম্ভাব্য জোটসঙ্গীদের বিষয়ে নিজের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে বেন-গভির প্রথমেই আরব দল রা’আম ও জয়েন্ট লিস্টের বিরোধিতা করেন। তার অভিযোগ, দল দুটি সন্ত্রাসীদের সমর্থন করে এবং ইসরাইলের ক্ষতি করতে চায়।
বিরোধী শিবিরের অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে সরকার গঠনের বিষয়েও আপত্তি জানিয়েছেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মতো নেতাদের নিয়ে জোট গঠন করলেও তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে বলে মন্তব্য করেন এই জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী।
তবে অতি-গোঁড়া ইহুদি সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক দল শাস এবং ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের (ইউটিজে) সঙ্গে জোটের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি তিনি। হারেদি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের প্রশ্নে মতবিরোধ থাকলেও দল দুটিকে সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করছেন বেন-গভির।
তার রাজনৈতিক বক্তব্য ও কর্মকাণ্ড নিয়ে ইসরাইলের ভেতরে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। সমালোচকদের মতে, তার কিছু বক্তব্য আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ছাড়া তার দায়িত্ব পালনের সময়, বিশেষ করে আরব জনগোষ্ঠীর মধ্যে অপরাধ বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়েও তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছেন।
প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে একাধিক পরিবর্তনের পরিকল্পনা
প্রতিরক্ষামন্ত্রী হওয়ার সুযোগ পেলে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীতে (আইডিএফ) বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে চান বেন-গভির। পুলিশের ক্ষেত্রে নিজের নেওয়া পদক্ষেপের মতো সেনাবাহিনীতেও পরিবর্তন আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
তার প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে বিলুপ্ত করা, ফিলিস্তিনিদের অভিবাসনে উৎসাহিত করা, বর্তমানে সেনাবাহিনীতে যোগ না দেওয়া হারেদি সম্প্রদায়ের আরও সদস্যকে সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা এবং সামরিক অভিযানের নিয়ম পরিবর্তন করা।
বেন-গভিরের দাবি, প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে এসব ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ পাবেন। এ কারণেই তিনি প্রকাশ্যে এই পদে নিজের প্রার্থিতা তুলে ধরতে চান।
তবে সামরিক বাহিনীতে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী হিসেবে তার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর জবাবে তিনি ৭ অক্টোবরের হামলার আগের পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন।
বেন-গভিরের দাবি, হামাসের বিরুদ্ধে গাজায় বোমা হামলার পক্ষে অবস্থান নেওয়ার সময় সামরিক কর্মকর্তারা তার বিরোধিতা করেছিলেন। তাদের বক্তব্য ছিল, সেনাবাহিনীতে চাকরি না করায় তিনি হামাসের অবস্থান ও উদ্দেশ্য বুঝতে পারছেন না। ওই জেনারেলরা মনে করতেন, হামাস শান্তি ও উত্তেজনা প্রশমনে আগ্রহী এবং নিজেদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত করতে চায়।
কিন্তু পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে নিজের মূল্যায়নই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন বেন-গভির। তার বক্তব্য, হামাস সম্পর্কে সতর্ক করার সময় সামরিক বাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ভুল ধারণা পোষণ করেছিলেন।
আন্তর্জাতিক সমালোচনার জবাব দিতে চান বেন-গভির
ইসরাইলের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে আন্তর্জাতিক সমালোচনার প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন বেন-গভির। প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে সমালোচকদের কাছে তিনি জানতে চাইবেন, তাদের নিজেদের দেশে একই ধরনের নিরাপত্তা হুমকি তৈরি হলে তারা কী পদক্ষেপ নিতেন।
তার মতে, কোনো দেশের সীমান্তে এমন একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী অবস্থান নিলে, যারা দেশটিকে ধ্বংস করা, নাগরিকদের হত্যা করা এবং শিশুদের ওপর হামলার হুমকি দেয়, তখন সেই দেশের সরকার তা মেনে নিতে পারে না। ইসরাইলের ক্ষেত্রেও একই যুক্তি প্রযোজ্য বলে মনে করেন তিনি।
সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার যোগাযোগের বিষয়টিও তুলে ধরেন বেন-গভির। তিনি জানান, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাসভবনে গিয়ে উষ্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন। পাশাপাশি ইসরাইলে অবস্থানরত মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গেও তার যোগাযোগ রয়েছে।
বেন-গভিরের দাবি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের অনেক কূটনীতিক ও রাষ্ট্রদূত তার বক্তব্যের তাৎপর্য বুঝতে পারেন। তার মতে, জিহাদি গোষ্ঠী, ইসলামিক স্টেট (আইএস) এবং ইসরাইলকে ঘৃণা করে ধ্বংস করতে চায়—এমন শক্তির বিরুদ্ধে দেশটি লড়াই করছে, এই বাস্তবতা আন্তর্জাতিক মহলের একাংশ উপলব্ধি করে।
সূত্র: জেরুজালেম পোস্ট



