দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরে আনতে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো নির্বাচন সংক্রান্ত স্পষ্টতা ও আস্থা প্রতিষ্ঠা করা। সরকারের দ্রুত সময় নির্ধারণ করে ঘোষণা করা উচিত কখন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা যেন শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠুভাবে হয়। আইনশৃঙ্খলার উন্নয়ন, জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা এবং সরকার, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থার পুনর্গঠন না হলে বিনিয়োগ পুনরায় সচল করা সম্ভব হবে না।
বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রির (বিসিআই) প্রেসিডেন্ট আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী (পারভেজ) জাগো নিউজকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, বর্তমানে কেউই পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছে না দেশ কোন দিকে যাচ্ছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বিনিয়োগের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বর্তমানে তা অনিশ্চিত। জাতীয় নির্বাচন কবে হবে তা নিয়ে নানা গুজব রয়েছে—কেউ বলছে ফেব্রুয়ারিতে হবে, আবার কেউ বলছে নাও হতে পারে। এই অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা কার্যকর সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না।
অপরদিকে, ব্যবসার খরচ বৃদ্ধি পাচ্ছে, জ্বালানি নিরাপত্তা দুর্বল, এবং আইনশৃঙ্খলার অবস্থা অপরিবর্তিত। ফলে ব্যবসায়িক পরিবেশ অত্যন্ত অস্থির হয়ে পড়েছে। যতক্ষণ না রাজনৈতিক স্থিতিশীল সরকার গড়ে ওঠে, বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি নিতে আগ্রহী হবেন না। বিনিয়োগ না বাড়লে কর্মসংস্থান কমে যাবে এবং দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি পাবে। তাই স্বল্পমেয়াদে সরকারের দায়িত্ব হলো দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা—শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের জন্য নয়, সাধারণ মানুষের জন্যও।
সরকার নানা পদক্ষেপ ও নীতিগত সহায়তার কথা বললেও, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ এখনও স্থবির। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, আইনের শাসনের দুর্বলতা এবং জ্বালানি অনিরাপত্তার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অনাগ্রহ ও সন্দেহ জন্ম নিয়েছে। বর্তমানে কেউই নিশ্চিত নয় দেশের ভবিষ্যত নিয়ে। ভোটের তারিখ নিয়ে গুজব থাকলেও সরকার থেকে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। সরকারের নীতিমালা ব্যবসাবান্ধব নয়, যা খরচ বৃদ্ধি করছে এবং এনার্জি সংকট ও আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণ হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে নির্বাচন হোক বা না হোক—দুটোরই আলাদা ধরনের সংকট এবং অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।
ব্যাংক খাতের পরিস্থিতিও সুখকর নয়। অনেক ব্যাংকের তারল্য সংকট দেখা দিয়েছে, এমনকি কিছু ভালো অবস্থায় থাকা ব্যাংকও বিনিয়োগ অর্থায়নে সমস্যা অনুভব করছে। শুধু অর্থের অভাব নয়, বিনিয়োগকারীরা তাদের অর্থ নিরাপদ থাকবে কি না, ফেরত পাবে কি না তা নিয়েও শঙ্কিত। নীতিমালা বারবার পরিবর্তিত হওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে দ্বিধা তৈরি হয়েছে।
এই পরিস্থিতি যদি চলতে থাকে, তাহলে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে এবং দারিদ্র্যের হার আরও বেড়ে যাবে। এ অবস্থায় স্বল্পমেয়াদে সরকারকে দ্রুত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে এবং আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের থেকে দূরে সরে গেছে, আমলারা নিষ্ক্রিয়, এবং বিচারব্যবস্থা থেকেও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র সহজে মিলছে না। এর ফলে বিনিয়োগকারীরা আত্মবিশ্বাস হারাচ্ছেন।
সরকারকে প্রথমেই স্পষ্টতা দিতে হবে—নির্বাচনের তারিখ নির্ধারণ ও তা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার গ্যারান্টি দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতা ও সরকার, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের মধ্যে আস্থা পুনর্গঠন অপরিহার্য। এসব নিশ্চয়তা না পেলে যতই নীতি ঘোষণা করা হোক, বিনিয়োগ সচল হবে না।
বর্তমান পরিস্থিতি মানুষের জীবন ও বিনিয়োগ উভয়ের জন্যই নিরাপত্তাহীনতার ইঙ্গিত দেয়। সরকারের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের দূরত্ব বাড়ছে, আমলারা নিষ্ক্রিয়, আর বিচার ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। যেন কেউ সাঁতার না জানে এমন গভীর জলে নামছে, অথচ রেসকিউয়ের নিশ্চয়তা নেই। এই অনিশ্চয়তার কারণে কেউই বিশ্বাস করে না যে সরকার তাদের নিরাপত্তা দিতে সক্ষম হবে।



