দেশে গ্যাসের সংকট এখনো কাটেনি। এর প্রভাব পড়েছে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও। গ্যাসের ঘাটতির কারণে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন কমেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কয়লার সংকট ও বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি। ফলে কয়েক দিন ধরে দেশে তীব্র লোডশেডিং চলছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ঢাকার বাইরের জেলা ও গ্রামের মানুষ।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, কয়েক দিন ধরে প্রতিদিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং হচ্ছে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। সোমবার রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ লোডশেডিং হয়েছে ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট। এর আগের দিন সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৬৭১ মেগাওয়াট।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। সোমবার সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের সময় চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৬২ মেগাওয়াট। বিপরীতে সরবরাহ করা হয় সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াটের মতো। অর্থাৎ ওই সময় উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দিয়েছে জ্বালানি সরবরাহে। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন নেমে এসেছে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে। গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক হতে আরও কয়েক দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। অন্যদিকে ব্যয়বহুল হওয়ায় তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সারা দিন পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো হচ্ছে না। সন্ধ্যার পর লোডশেডিং কমাতে এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো হলেও মধ্যরাতের পর তা আবার কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এর মধ্যে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও পুরো সক্ষমতায় উৎপাদন করতে পারছে না। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটে রক্ষণাবেক্ষণ শুরু হওয়ায় ২ আগস্ট থেকে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে যায়। গত রোববার রাত থেকে কেন্দ্রটি আবার উৎপাদন বাড়াতে শুরু করেছে। তবে কেন্দ্রটির পাওনা ৯ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিল পরিশোধ না হলে আগামী মাস থেকে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রেও কয়লার স্বল্পতা দেখা দিয়েছে। একইভাবে ভারতের ঝাড়খন্ডে নির্মিত আদানির বিদ্যুৎকেন্দ্র ৭ আগস্ট থেকে উৎপাদন কমিয়েছে। ঝড়-বৃষ্টির কারণে কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় কেন্দ্রটি স্বাভাবিক উৎপাদন ধরে রাখতে পারেনি। তবে জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান ফাইভ ডব্লিউ কমিউনিকেশনসের মাধ্যমে মঙ্গলবার রাতে কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ১২ আগস্টের মধ্যে কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা।
পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনে বর্তমানে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর ওপরই বড় ধরনের নির্ভরতা তৈরি হয়েছে। গ্যাসের সংকট, কয়লার সরবরাহ কমে যাওয়া এবং তেলচালিত কেন্দ্রের উচ্চ উৎপাদন ব্যয়ের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।
এদিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও সংকট কাটেনি। জুনে পাইকারি পর্যায়ে গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বিপুল পাওনা পরিশোধ করতে পারছে না পিডিবি। বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কাছে পিডিবির বকেয়া প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত আওয়ামী লীগ সরকারের দেড় দশকে পাইকারি পর্যায়ে ১২ বার এবং খুচরা পর্যায়ে ১৪ বার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়নি। জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত না করেই একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক কেন্দ্র বসে থাকলেও সেগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। ফলে পিডিবির ওপর জমেছে বিপুল আর্থিক দায়। পাশাপাশি সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও প্রতিবছর বেড়েছে।
পিডিবির দুই দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সুফল পেতে প্রায় দুই মাস সময় লাগে। ফলে বাড়তি আয় এখনো পিডিবির হিসাবে পুরোপুরি আসেনি। তবে তাঁদের দাবি, দাম বাড়ানোর পর পিডিবির বকেয়া নতুন করে বাড়বে না এবং পুরোনো বকেয়া ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হবে।
ঢাকার বাইরে বেশি ঘাটতি
ঢাকার দুই বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থা ডেসকো ও ডিপিডিসির সূত্র বলছে, রাজধানীতে বিদ্যুতের চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ঘাটতি নেই। তবে ঢাকার বাইরের চার বিতরণ সংস্থার এলাকায় পরিস্থিতি ভিন্ন। বিশেষ করে সারা দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী পল্লী বিদ্যুতের গ্রাহকেরা বেশি লোডশেডিংয়ের শিকার হচ্ছেন।
ফেনী জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে প্রতিদিন গড়ে ৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে। জেলার একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের পরিচালক মো. মাইন উদ্দিন জানান, কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ৩৫ শতাংশ সময় লোডশেডিং হচ্ছে। ফেনী পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের এজিএম মোহাম্মদ বাইজিদ হোসেন শাহ বলেন, জেলায় বর্তমানে প্রায় ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ ঘাটতি রয়েছে।
নেত্রকোনায় পরিস্থিতি আরও সংকটজনক। স্থানীয় বাসিন্দা খালিদ জানান, ২৪ ঘণ্টায় গড়ে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাওয়া যায় না। নেত্রকোনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মহাব্যবস্থাপক আকরাম হোসেন বলেন, ১৫৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৫৯ মেগাওয়াট। ফলে ঘন ঘন লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
হবিগঞ্জের কোথাও কোথাও প্রায় ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকছে না। এতে চা–শিল্পেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা–বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক দেবাশীষ রায় বলেন, চা–পাতা প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে পাতা নষ্ট হয়ে যায়। এতে বাগানগুলোকে লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কেরানীগঞ্জেও ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ে ভোগান্তি বেড়েছে। গোলামবাজারের বাসিন্দা হাসান কবির টুটুল বলেন, দিনে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। প্রচণ্ড গরমে বিদ্যুৎ চলে গেলে শিশুরা ঘুম থেকে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে। রাতেও স্বস্তিতে ঘুমানোর সুযোগ হচ্ছে না। ঢাকা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-৪-এর মহাব্যবস্থাপক গোলাম কাউসার তালুকদার জানান, কেরানীগঞ্জে বিদ্যুতের চাহিদা ২৪০ মেগাওয়াট। প্রতিদিন প্রায় ৮০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
দীর্ঘ সময় লোডশেডিংয়ের কারণে নীলফামারীর ডোমার উপজেলার গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার এবং নিয়মিত পুলিশ টহলের ব্যবস্থা চেয়ে ডোমার থানায় লিখিত আবেদন করেছে নীলফামারী পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।
আবেদনে বলা হয়েছে, জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির কারণে বরাদ্দ অনুযায়ী বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং করে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। গরমের মধ্যে এতে গ্রাহকদের দুর্ভোগ বাড়ছে এবং জনমনে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারের প্রয়োজন রয়েছে।
নীলফামারী জেলা সদরের বাসিন্দা নিলা বলেন, কয়েক দিন ধরে তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুতের লোডশেডিংয়ে কাজকর্ম করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কখন আবার আসবে, তারও ঠিক নেই।
ডোমার উপজেলা নেসকোর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নওশাদ আলী বলেন, প্রয়োজনের তুলনায় অর্ধেক বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে ২৪ ঘণ্টায় ১০ ঘণ্টাও বিদ্যুৎ পাচ্ছেন না গ্রাহকেরা।
সব মিলিয়ে গ্যাস ও কয়লার সংকট, তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, কেন্দ্রগুলোর আর্থিক সংকট এবং কারিগরি সমস্যার কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছে। রাজধানীর তুলনায় ঢাকার বাইরের জেলা ও গ্রামাঞ্চলে এর প্রভাব বেশি পড়ছে। গরম অব্যাহত থাকলে এবং জ্বালানি সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে লোডশেডিং পরিস্থিতি আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।



