দুর্গাপূজা নির্বিঘ্নে ও শান্তিপূর্ণভাবে উদ্যাপন এবং ঘরমুখী মানুষের যাতায়াত স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে বিশেষ নিরাপত্তা ও পরিবহনব্যবস্থা গ্রহণ করেছে সরকার। পূজাকে কেন্দ্র করে প্রাক-পূজা, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা-পরবর্তী সময়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে পুলিশ। অন্যদিকে, যাত্রীদের চাপ সামাল দিতে তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানোর পাশাপাশি পাঁচটি নিয়মিত ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
দুর্গাপূজায় নিরাপত্তায় পুলিশের বিশেষ প্রস্তুতি
হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদ্যাপনের লক্ষ্যে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির।
গতকাল দুপুরে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের হল অব প্রাইডে দুর্গাপূজা উপলক্ষে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত এক সভায় তিনি এ কথা বলেন।
আইজিপি জানান, দুর্গাপূজাকে ঘিরে পুলিশের নিরাপত্তা কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কোনো ব্যক্তি, মহল বা গোষ্ঠী যাতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক ও সজাগ থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে কমিউনিটি পুলিশিং ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অন্যান্য বছরের মতো এবারও নিরাপদ ও আনন্দঘন পরিবেশে দুর্গাপূজা উদ্যাপন সম্ভব হবে।
পূজার নিরাপত্তায় পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদাপোশাকের পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। একই সঙ্গে সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), ক্রাইম সিন ভ্যান ও বোমা নিষ্ক্রিয়করণ ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সসহ বিভিন্ন পুলিশ ইউনিটে চালু থাকবে মনিটরিং সেল।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর পোস্ট, অপপ্রচার, গুজব কিংবা ছবি প্রকাশের মাধ্যমে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা ঠেকাতে মাঠপর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা এবং পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের নির্দেশনাও দিয়েছেন আইজিপি।
পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ও স্বেচ্ছাসেবক রাখার নির্দেশ
পূজা উদ্যাপন পরিষদের নেতাদের উদ্দেশে আইজিপি বলেন, যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা নিকটস্থ থানায় যোগাযোগ করতে হবে।
তিনি পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা, সিসিটিভি ক্যামেরা সচল রাখা এবং বিকল্প বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য স্ট্যান্ডবাই জেনারেটর প্রস্তুত রাখার পরামর্শ দেন। প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত আইজি (প্রশাসন) এ কে এম আওলাদ হোসেন, এসআরইউর অতিরিক্ত আইজি মো. রেজাউল করিম, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ, নৌ-পুলিশের অতিরিক্ত আইজি মো. রেজাউল করিম, এসআরবির মহাপরিচালক (অতিরিক্ত আইজি) মো. আহসান হাবীব পলাশ, হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান তপন মজুমদার, বাংলাদেশ হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি নির্মল রোজারিও ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মনীন্দ্র কুমার নাথ এবং বাংলাদেশ পূজা উদ্যাপন পরিষদের সভাপতি বাসুদেব ধরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
পূজায় তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন, পাঁচটির ছুটি বাতিল
দুর্গাপূজা উপলক্ষে ঘরমুখী যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন, নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করতে তিন জোড়া বিশেষ ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। পাশাপাশি যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে পাঁচটি নিয়মিত ট্রেনের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
গতকাল সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে দুর্গাপূজা উপলক্ষে পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিয়ে আয়োজিত প্রস্তুতিমূলক সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১৯ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত বিভিন্ন দিনে বিশেষ ট্রেন পরিচালনা ও নিয়মিত ট্রেনের ছুটি বাতিলের ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
যেসব রুটে চলবে বিশেষ ট্রেন
রেলওয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে চলবে ঢাকা স্পেশাল-৩। ঢাকা-কক্সবাজার-ঢাকা রুটে ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর চলাচল করবে ট্যুরিস্ট স্পেশাল-১ ও ট্যুরিস্ট স্পেশাল-২। এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলবে চট্টগ্রাম স্পেশাল-৪।
যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে কক্সবাজার এক্সপ্রেসের ১৯ ও ২০ অক্টোবরের সাপ্তাহিক ছুটি বাতিল করা হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলে জাহানাবাদ এক্সপ্রেস ও রূপসী বাংলা এক্সপ্রেসের ১৯ অক্টোবর, পদ্মা এক্সপ্রেসের ২০ অক্টোবর এবং মধুমতি এক্সপ্রেসের ২৪ অক্টোবরের ছুটিও প্রত্যাহার করা হয়েছে। ফলে নির্ধারিত দিনগুলোতে ট্রেনগুলো নিয়মিত চলাচল করবে।
বাড়ানো হচ্ছে ট্রেনের কোচ
পূজার সময়ে যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা বাড়াতে পূর্বাঞ্চলে ২৩টি মিটারগেজ কোচ এবং পশ্চিমাঞ্চলে ছয়টি ব্রডগেজ কোচ যাত্রীবাহী ট্রেনের বহরে যুক্ত করার পরিকল্পনা নিয়েছে রেলওয়ে। পাশাপাশি ট্রেনের চাহিদা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ইঞ্জিন সরবরাহ নিশ্চিত করার কথাও জানিয়েছে সংস্থাটি।
নিরাপত্তা জোরদার, বিশেষ ট্রেন পরিচালনা, নিয়মিত ট্রেনের ছুটি বাতিল এবং অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের মাধ্যমে দুর্গাপূজার সময় যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য।



