১৭২৪ সালে নির্মিত যন্তর মন্তর পেরিয়েছে তিনশ বছরেরও বেশি সময়। ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি মূলত একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির হলেও বর্তমানে দিল্লিতে প্রতিবাদ ও জনসমাবেশের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। রাজধানীতে কোনো বিক্ষোভ বা আন্দোলন হলেই প্রায়ই প্রতিবাদকারীদের গন্তব্য হয়ে ওঠে যন্তর মন্তর। কিন্তু কেন দিল্লিতে বিক্ষোভ বা জনসমাবেশ মানেই যন্তর মন্তর?
সাম্প্রতিক সময়ে ‘ককরোচ’ আন্দোলনকে ঘিরে উত্তপ্ত দিল্লি। আন্দোলনকারীদের অবস্থান ও প্রতিবাদের কেন্দ্রও এই যন্তর মন্তর। ন্যায্য বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের অনশন, ছাত্রসমাজের বিক্ষোভ এবং সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুকের অবস্থান কর্মসূচির মতো সাম্প্রতিক নানা আন্দোলনেও এই স্থানটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
যন্তর মন্তরকে প্রতিবাদের নির্ধারিত স্থান হিসেবে বেছে নেওয়ার ইতিহাস অবশ্য বেশ পুরোনো। এর জন্য ফিরে যেতে হয় ১৯৯৩ সালে। ওই সময় সংসদ ভবনের আশপাশে সমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। নাগরিকদের প্রতিবাদের অধিকার এবং রাজধানীর নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে এরপর যন্তর মন্তর রোডকে বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
এর আগে, গত শতকের নব্বইয়ের দশকের পূর্বে দিল্লির প্রধান প্রতিবাদস্থল ছিল বোট ক্লাব। সেখানকার লনে নিয়মিত সমাবেশ করতেন আন্দোলনকারীরা। ১৯৮৮ সালে প্রায় পাঁচ লাখ কৃষকের বিশাল সমাবেশের পর পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ব্যাপক জনসমাগমে রাজধানীর ওই এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ায় বোট ক্লাবে বড় ধরনের সমাবেশ নিষিদ্ধ করার দাবি জোরালো হয়। শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে তা কার্যকর করা হয়।
এরপর থেকেই রাজধানীতে বিভিন্ন ধরনের জনসভা ও প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য যন্তর মন্তর তুলনামূলকভাবে সহজে প্রবেশযোগ্য একটি নির্ধারিত স্থান হিসেবে গড়ে ওঠে। দীর্ঘস্থায়ী অবস্থান কর্মসূচি বা বড় সমাবেশের কারণে কখনো কখনো যানজট ও জনদুর্ভোগ তৈরি হলেও প্রশাসনের কাছে নিজেদের দাবি তুলে ধরতে চাওয়া নাগরিকদের জন্য জায়গাটি গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লির প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত হলেও যন্তর মন্তর থেকে সংসদ ভবন ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দূরত্ব কিছুটা বেশি। ফলে এখানে বিক্ষোভ বা সমাবেশের কারণে সৃষ্ট যানজট ও অন্যান্য সমস্যা সরাসরি ওই গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলে না। ২০১৮ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও জানায়, যন্তর মন্তরে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ নাগরিকদের মৌলিক অধিকারের অংশ। তবে অবশ্যই তা আইন মেনে করতে হবে।
এদিকে, চলতি বছরের মে মাসে ভারতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এক শুনানিতে বেকার যুবকদের পরোক্ষভাবে ‘তেলাপোকা’ বা সমাজের পরজীবী হিসেবে উল্লেখ করেছেন—এমন অভিযোগ ওঠে। এর প্রতিবাদে রাজনৈতিক কৌশলবিদ অভিজিৎ দিপকে ১৬ মে ব্যঙ্গাত্মকভাবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) নামে একটি সংগঠন গঠন করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটির অনুসারীর সংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখ ছাড়িয়ে যায় বলে দাবি করা হয়।
২০ জুলাই, সোমবার, সিজেপির ডাকে প্রায় ২০ হাজার তরুণ ও শিক্ষার্থী নয়াদিল্লির সংসদ ভবনের দিকে পদযাত্রার চেষ্টা করলে মধ্য দিল্লির পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। যন্তর মন্তর ও কনট প্লেস এলাকায় পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে আন্দোলনকারীদের বাধা দেয়। এ সময় লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে।
ঘটনার পর আন্দোলনকারীদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে সিজেপির প্রধান অভিজিৎ দিপকে জানান, আপাতত তারা নতুন কোনো সড়ক পদযাত্রা করবেন না। তবে দিল্লির যন্তর মন্তরে তাদের অনির্দিষ্টকালের অবস্থান ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
এভাবেই তিনশ বছরের পুরোনো একটি জ্যোতির্বিজ্ঞান মানমন্দির সময়ের সঙ্গে বদলে গিয়ে দিল্লির নাগরিক প্রতিবাদ, আন্দোলন ও গণদাবি জানানোর অন্যতম প্রতীকী স্থানে পরিণত হয়েছে।



