tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকইউক্রেন যুদ্ধে ৫ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত: ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান

ইউক্রেন যুদ্ধে ৫ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত: ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান

ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫ লাখের বেশি রুশ সেনা নিহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা স্টাফের প্রধান এয়ার চিফ মার্শাল স্যার রিচার্ড নাইটন। তাঁর হিসাব অনুযায়ী, যুদ্ধটিতে রাশিয়ার মোট সেনা হতাহতের সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়েছে।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

নাইটন বলেন, রাশিয়ার বিপুল সেনাবাহিনী ও সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারছে না মস্কো। পশ্চিমা কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, চলতি বছর ইউক্রেনে রুশ বাহিনীর অগ্রযাত্রার গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

যুক্তরাজ্যের দেওয়া এই হিসাব ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর প্রকাশিত পরিসংখ্যানের সঙ্গেও মোটামুটি সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি রুশ কর্তৃপক্ষ। মস্কো ও কিয়েভ—কোনো পক্ষই নিয়মিতভাবে নিজেদের সেনাদের হতাহত হওয়ার পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে না।

বিপুল সামরিক সরঞ্জাম হারিয়েছে রাশিয়া

নাইটনের হিসাব অনুযায়ী, ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়া ১০ হাজারের বেশি সাঁজোয়া ও সুরক্ষিত যান হারিয়েছে। এ ছাড়া প্রায় ৩ হাজার আকাশ প্রতিরক্ষা ও কামান ব্যবস্থা এবং ৩৭০টির বেশি উড়োজাহাজ ও হেলিকপ্টার ধ্বংস বা হারিয়েছে রুশ বাহিনী।

তবে একই সময়ে ইউক্রেনের কত সেনা নিহত বা আহত হয়েছেন, সে বিষয়ে কোনো হিসাব দেননি ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান।

কিয়েভে জ্বালানি স্টেশনে রুশ ড্রোন হামলা

এদিকে শুক্রবার টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কিয়েভের সড়কপাশের জ্বালানি স্টেশনগুলোতে রুশ ড্রোন হামলা হয়েছে। ইউক্রেনীয় কর্মকর্তাদের দাবি, বেসামরিক মানুষকে আতঙ্কিত করতে বিমান হামলার পরিধি বাড়িয়েছে মস্কো।

কিয়েভে রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি উক্রনাফতারের দুটি স্টেশনে হামলা হয়। ইউক্রেনের প্রসিকিউটর কার্যালয় জানিয়েছে, এর একটিতে দুইজন নিহত এবং ছয়জন আহত হয়েছেন।

সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ইউক্রেনের শহরাঞ্চলের জ্বালানি স্টেশনগুলোতে রুশ হামলা বেড়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ও দক্ষিণ ইউক্রেনের সম্মুখসারির কাছাকাছি এলাকাগুলোতে এসব হামলা বেশি হচ্ছে। ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, বেসামরিক জীবন ব্যাহত ও মানুষের মনোবল দুর্বল করার বৃহত্তর অভিযানের অংশ হিসেবে এসব হামলা চালানো হচ্ছে।

খাদ্য বিতরণ কেন্দ্রও হামলার লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে বলে জানিয়েছে ইউক্রেন। এর ফলে কিয়েভের কিছু সুপারমার্কেটের তাক মাঝেমধ্যে খালি হয়ে যাচ্ছে।

ইউক্রেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্দ্রি সিবিহা বৃহস্পতিবার রাতে এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, রাশিয়া পরিকল্পিতভাবে এমন জায়গাগুলোতে হামলা চালাচ্ছে, যেখানে মানুষ দৈনন্দিন প্রয়োজনে যাতায়াত করে। তাঁর দাবি, এর উদ্দেশ্য হতাহতের সংখ্যা বাড়ানো, আতঙ্ক ছড়ানো এবং ইউক্রেনীয় সমাজের ওপর চাপ সৃষ্টি করা।

বিমান হামলার সতর্কতা জারি হলে জ্বালানি স্টেশনসহ খোলা ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনার আশপাশে অবস্থান না করতে বাসিন্দাদের সতর্ক করেছে ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ।

রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের হামলা

অন্যদিকে রাশিয়ার ভূখণ্ডের গভীরে দূরপাল্লার ড্রোন হামলা আরও জোরদার করেছে ইউক্রেন। এর ফলে দেশটির বিস্তীর্ণ এলাকায় আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ছে।

বৃহস্পতিবার ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী জানায়, সাইবেরিয়ায় ৩ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি দূরের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালানো হয়েছে। রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ তেল খাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করাই এসব হামলার অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছে কিয়েভ।

ইউক্রেনীয় হামলার কারণে রাশিয়ায় জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে বলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

ফিনল্যান্ডভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগস্টে রাশিয়ার পরিশোধিত তেলজাত পণ্য রপ্তানি রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। একই সময়ে দেশটির জ্বালানি আমদানি বেড়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে রাশিয়ার জ্বালানি আমদানি বেড়ে ১ লাখ ৭২ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়, যা আগের মাসিক সর্বোচ্চ রেকর্ডের তুলনায় সাত গুণেরও বেশি। একসময় বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলজাত পণ্য রপ্তানিকারক রাশিয়া এখন দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকেও জ্বালানি আমদানি করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এক রাতে ৭৭৭ ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিতের দাবি রাশিয়ার

বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত ইউক্রেন বড় ধরনের ড্রোন হামলা চালিয়েছে বলে দাবি করেছে রাশিয়া।

রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি, রাশিয়ার ১৬টি অঞ্চলের পাশাপাশি দখলকৃত ক্রিমিয়া এবং আজভ ও ক্যাস্পিয়ান সাগরের ওপর মোট ৭৭৭টি ইউক্রেনীয় ড্রোন শনাক্ত ও ধ্বংস করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

মস্কোর দক্ষিণে তুলা অঞ্চলে রাতভর ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় দুইজন নিহত ও তিনজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কর্মকর্তারা।

রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সারাতভে একটি তেল শোধনাগারেও রাতের ড্রোন হামলায় আগুন ধরে যায় বলে জানিয়েছে রুশ স্বাধীন অনলাইন সংবাদমাধ্যম আস্ত্রা। এর আগে একাধিকবার ওই শোধনাগারে হামলা হয়েছে। সর্বশেষ গত আগস্টের শুরুতে সেখানে হামলা চালানো হয়েছিল।

সারাতভ শহরের একটি লজিস্টিকস স্থাপনাতেও ইউক্রেনীয় ড্রোন আঘাত হেনে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে জানিয়েছে রাশিয়ার অনলাইন খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ওজোন। তবে এতে কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

‘রাশিয়ার যুদ্ধ চালানোর সক্ষমতা কমানোই লক্ষ্য’

ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানিয়েছেন, রাতভর দূরপাল্লার হামলায় রাশিয়ার আটটি অঞ্চলে বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে ইউক্রেনীয় বাহিনী। এর মধ্যে সারাতভ অঞ্চলের একটি ব্যবসায়িক স্থাপনা ও তেল শিল্পের একটি স্থাপনাও রয়েছে।

শুক্রবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, এসব হামলার মূল লক্ষ্য হলো যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার রাশিয়ার সক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।

এদিকে রাশিয়ার আগ্রাসন পঞ্চম বছরে প্রবেশ করায় ইউক্রেন নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। বৃহস্পতিবার কানাডার কাছ থেকেও নতুন করে সহায়তার প্রতিশ্রুতি পেয়েছে কিয়েভ।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)