tanaka

ধর্মের নামে বিভাজন ও সাম্প্রদায়িকতা চাই না: রাষ্ট্রপতি

দেশে ধর্মের নামে বিভাজন ও সাম্প্রদায়িকতা চান না বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
প্রচ্ছদসর্বশেষ সংবাদঅর্থনীতিগ্যাস সংকটে স্থবির শিল্পের চাকা, উৎপাদন কমেছে ৩০–৪০ শতাংশ

গ্যাস সংকটে স্থবির শিল্পের চাকা, উৎপাদন কমেছে ৩০–৪০ শতাংশ

গ্যাস সংকটে নারায়ণগঞ্জের তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইলশিল্পে নেমে এসেছে স্থবিরতা। গ্যাসের অভাবে ডাইং কারখানায় কাপড় রং ও শুকানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে সময়মতো কাপড় সরবরাহ না হওয়ায় ধীরগতিতে চলছে কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে রপ্তানি কার্যক্রমেও। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাঠাতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী বিল থেকে ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে বাড়ছে লোকসান, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থাও কমছে। নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।

শিল্পসংশ্লিষ্টদের হিসাবে, গ্যাস সংকটের কারণে গত কয়েক সপ্তাহে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন কারখানায় উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প। গ্যাসের অভাবে কাপড় রং ও শুকানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে পুরো পোশাক উৎপাদন চেইনে।

নারায়ণগঞ্জে প্রায় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০টি পোশাকশিল্প-সংশ্লিষ্ট কারখানা রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন প্রায় ২০ লাখ শ্রমিক। একটি পোশাক তৈরির পুরো প্রক্রিয়ায় ডাইং, নিটিং, অ্যাকসেসরিজ, কাটিং, সেলাই, ফিনিশিং ও প্যাকেজিং পরস্পরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত। ফলে একটি ধাপে উৎপাদন ব্যাহত হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো শিল্পে। গ্যাস সংকটে জেলার দেড় শতাধিক ডাইং কারখানার উৎপাদন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে।

উদ্যোক্তারা জানান, যে কারখানায় প্রতিদিন ৩০ টন কাপড় রং করার সক্ষমতা রয়েছে, সেখানে এখন অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদন নেমে এসেছে মাত্র ১ থেকে ২ টনে। এর আগে কিছু প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে সিলিন্ডারে গ্যাস এনে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা করলেও নতুন নির্দেশনার পর সেই সুযোগও বন্ধ হয়ে গেছে। মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে যান্ত্রিক ত্রুটির পর জাতীয় গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এর বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে।

গ্যাস সংকটের পাশাপাশি উৎপাদন ব্যাহত হওয়া ও ছুটি সমন্বয়ের কারণে গত বৃহস্পতিবার নারায়ণগঞ্জের বেশিরভাগ তৈরি পোশাক কারখানা বন্ধ রাখা হয়। শহরের পুলিশ লাইন্স এলাকার রহমান গার্মেন্টসসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বুধবারের সরকারি ছুটি ও শুক্রবারের সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে বৃহস্পতিবারের ছুটি সমন্বয় করেছে। এর আগে শুক্রবার অতিরিক্ত কাজ করিয়ে ওই ছুটি সমন্বয় করা হয়।

বিসিক শিল্পনগরীর বেশিরভাগ গার্মেন্টসও বৃহস্পতিবার বন্ধ ছিল। তবে বিদ্যুতের ওপর চাপ কম থাকায় ৪৬৫টি নিটিং কারখানায় গার্মেন্টসের জন্য প্রয়োজনীয় থান কাপড়ের উৎপাদন চালু রাখা হয়।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) তথ্য অনুযায়ী, বিসিক শিল্পনগরীতে মোট ২৫৬টি গার্মেন্টস কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার বেশিরভাগই বৃহস্পতিবার উৎপাদন বন্ধ রেখেছে। বিসিকের বাইরে থাকা রপ্তানিমুখী ও সাব-কন্ট্রাক্টভিত্তিক অধিকাংশ কারখানাও একইভাবে ছুটি দিয়েছে।

একসময় ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে পরিচিত নারায়ণগঞ্জের শিল্পাঞ্চলে এখন উদ্বেগ বাড়ছে। গত এক বছরে জেলায় দুই ডজনের বেশি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এতে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়েছেন। ব্যবসায়ীদের মতে, গ্যাস সংকটের সঙ্গে উচ্চ সুদহার, রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, শ্রমিক অসন্তোষ ও উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার মতো নানা কারণে শিল্প খাত কঠিন সময় পার করছে।

বিকেএমইএর সিনিয়র সহসভাপতি মোর্শেদ সারোয়ার সোহেল বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাস সংকটের কারণে জেলার বিভিন্ন কারখানায় ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন কমেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ডাইং শিল্প। ডাইং কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় গার্মেন্টসে কাপড় পৌঁছাতে দেরি হচ্ছে। ফলে কাটিং, সেলাই ও ফিনিশিংয়ের কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং সময়মতো শিপমেন্ট দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

তিনি জানান, সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ক্রেতারা চুক্তি অনুযায়ী ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ কেটে রাখছেন। এতে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের প্রতি আস্থাও কমছে। নতুন অর্ডার পাওয়া নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। একটি বড় গার্মেন্টস কারখানা একদিন বন্ধ থাকলে প্রায় ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। মাঝারি কারখানার ক্ষেত্রেও প্রতিদিন ২০ থেকে ৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত স্থায়ী ব্যয় বহন করতে হচ্ছে। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতনসহ অন্যান্য খরচ দিতে হচ্ছে। তবে চলতি মাসেই গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি।

ফতুল্লার পঞ্চবটীর বিসিক হোসিয়ারি পল্লি মালিক সমিতির পরিচালক শহীদুল ইসলাম বলেন, গার্মেন্টস কারখানার বেশিরভাগ বন্ধ থাকলেও ৪৬৫টি নিটিং কারখানা চালু রাখা হবে। গার্মেন্টস বন্ধ থাকায় বিদ্যুতের ওপর চাপ কমবে। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিটিং কারখানাগুলোতে প্রয়োজনীয় থান কাপড় উৎপাদন করা হবে।

বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, চলমান জ্বালানি সংকটে দেশের তৈরি পোশাক খাত ইতোমধ্যে প্রায় এক বিলিয়ন ডলারের ক্ষতির মুখে পড়েছে। সময়মতো উৎপাদন ও শিপমেন্ট দিতে না পারায় অনেক বিদেশি ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে নতুন অর্ডার দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ছেন। এসব অর্ডার ধীরে ধীরে ভিয়েতনাম ও ভারতের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে একের পর এক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এতে বেকারত্ব বাড়ার পাশাপাশি শিল্প খাতে অনিশ্চয়তা আরও গভীর হবে এবং দেশের অর্থনীতিও বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।