নতুন করে হালনাগাদ করা গুগল ম্যাপসের স্যাটেলাইট ছবিতে গাজায় দীর্ঘ তিন বছরের যুদ্ধের ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর বড় একটি অংশ। একই সঙ্গে ভূখণ্ডটির প্রায় ২৩ লাখ মানুষের চলমান মানবিক সংকটও ফুটে উঠেছে এসব ছবিতে।
চলতি বছরের জুনে ধারণ করা স্যাটেলাইট ছবিগুলোতে দেখা যায়, প্রায় ১২ মাস আগে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও গাজার বিভিন্ন এলাকায় ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন আরও বিস্তৃত হয়েছে। উপকূলজুড়ে গড়ে উঠেছে বিশাল তাঁবুর ক্যাম্প। কোথাও কোথাও সমুদ্রসৈকত থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরেই দেখা যাচ্ছে অস্থায়ী তাঁবু।
একসময় ব্যস্ত থাকা গাজার প্রধান সমুদ্রবন্দরটিও এখন ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও প্রায় জনশূন্য। সেখানে কোনো মাছ ধরার নৌকা চোখে পড়ে না। বরং বন্দরটির আশপাশের এলাকাজুড়ে গড়ে উঠেছে অস্থায়ী আবাসস্থল।
গাজা সিটির যেসব খোলা জায়গা এখনো অবশিষ্ট রয়েছে, সেগুলোও শ্যাক, তাঁবু ও অস্থায়ী কুঁড়েঘরে পরিণত হয়েছে। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া ও বেইত হানুনের মতো শহরগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতিও স্যাটেলাইট ছবিতে স্পষ্ট। খান ইউনিসের ইস্তিকলাল মসজিদের মতো উপাসনালয় ধ্বংস হয়ে যাওয়ার চিত্রও উঠে এসেছে।
গাজা সিটির জাবালিয়া ও শুজাইয়ার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় একাধিকবার ইসরাইলি সামরিক অভিযান চালানো হয়েছিল। নতুন স্যাটেলাইট ছবিতে এসব এলাকার বড় অংশকেই এখন বসবাসের অনুপযোগী অবস্থায় দেখা যাচ্ছে।
দক্ষিণ গাজাতেও বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে ধ্বংসস্তূপ ছড়িয়ে রয়েছে। মিশর সীমান্তসংলগ্ন এলাকায় ইসরাইলি বাহিনী একটি বিস্তৃত এলাকা পরিষ্কার করেছে বলেও স্যাটেলাইট ছবিতে ধারণা পাওয়া যায়। রাফাহ শহরের বড় অংশ প্রায় পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে তেল আল-সুলতান এলাকাতেও।
জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ’র তথ্য অনুযায়ী, গাজায় ২১ লাখের বেশি বাস্তুচ্যুত মানুষ বর্তমানে তাঁবু ও অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে বসবাস করছেন। ভূখণ্ডটির প্রায় ৮২ শতাংশ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে।
জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গাজায় ধ্বংস হওয়া স্থাপনার সংখ্যা আরও ৯ শতাংশ বেড়েছে।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর ফিলিস্তিনবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি জ্যাকো সিলিয়ার্স গত মাসে দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, গাজায় জমে থাকা ধ্বংসস্তূপের পরিমাণ আনুমানিক ৬ কোটি ১০ লাখ টন।
ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো মানুষের মরদেহ চাপা পড়ে থাকার আশঙ্কা গাজার অন্যতম জরুরি মানবিক সংকট হয়ে রয়েছে। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় ৭৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। নিহতদের বড় অংশই বেসামরিক নাগরিক।
২০২৩ সালের অক্টোবরে ইসরাইলে হামাসের আকস্মিক হামলার মধ্য দিয়ে এই সংঘাতের সূত্রপাত হয়। ওই হামলায় হামাসের যোদ্ধারা প্রায় ১ হাজার ২০০ মানুষকে হত্যা করে। একই সময়ে আরও ২৫১ জনকে জিম্মি করা হয়।
এরপর শুরু হওয়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে গাজায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট ছবিগুলো সেই মানবিক বিপর্যয়েরই আরও একটি দৃশ্যমান চিত্র তুলে ধরেছে।



