প্যারিসের রাজপথে ক্রমেই তীব্র হচ্ছে অর্থনৈতিক অসন্তোষ ও প্রতিবাদ। আয়-ব্যয়ের ভারসাম্যহীনতা, ক্রমবর্ধমান বাজেট ঘাটতি এবং বিপুল ঋণের বোঝায় চাপে পড়েছে ফ্রান্সের অর্থনীতি। ইউরোপের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতি উদ্বেগ বাড়াচ্ছে পুরো অঞ্চলে। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, ইউরোপের এই ঋণসংকটের অভিঘাত কি এবার আছড়ে পড়তে পারে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রেও?
পরিসংখ্যান বলছে, বিপুল ঋণ ও বাজেট ঘাটতির চাপে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও রয়েছে। তবে অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশটি এখনই ফ্রান্সের মতো সরাসরি অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে না পড়লেও ভবিষ্যতে বড় সংকটে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে লাগামহীন ঋণ এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা এ ক্ষেত্রে বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের পরিমাণ প্রায় ৩২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা দেশটির বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) কাছাকাছি। একই সময়ে দেশটির বার্ষিক বাজেট ঘাটতি ছাড়িয়েছে ২ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৬ শতাংশেরও বেশি। বিপুল এই ঋণ ও ঘাটতি সামাল দেওয়া মার্কিন সরকারের জন্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ঋণের সুদ পরিশোধেই যুক্তরাষ্ট্রকে বছরে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। দেশটির মোট ফেডারেল বাজেটের প্রায় ১৪ শতাংশ চলে যাচ্ছে এই খাতে। অর্থাৎ, কর থেকে সরকারের সংগৃহীত অর্থের উল্লেখযোগ্য একটি অংশই ব্যয় হচ্ছে পুরোনো ঋণের সুদ মেটাতে। এতে জনকল্যাণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের জন্য সরকারের আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ বাড়ছে।
ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঋণসংকট মোকাবিলায় কর বৃদ্ধি, সরকারি ব্যয় সংকোচন এবং আর্থিক শৃঙ্খলা জোরদারের মতো কঠিন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা করছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনে ঋণ ও বাজেট ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে তেমন কার্যকর ঐকমত্যের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। রাজনৈতিক বিভাজন ও দলীয় স্বার্থের সংঘাত সংকট মোকাবিলার উদ্যোগকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিকে কিছুটা সুরক্ষা দিচ্ছে মার্কিন ডলারের বৈশ্বিক আধিপত্য। বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে ডলারের অবস্থান যুক্তরাষ্ট্রকে তুলনামূলক সহজে ঋণ সংগ্রহের সুযোগ দেয়। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধিও দেশটির অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে।
কিন্তু এসব সুবিধা দীর্ঘমেয়াদে ঋণসংকটের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর করতে পারবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের ঋণসীমা বা ‘ডেট সিলিং’ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক দরকষাকষি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
দেশটির আইনগত ঋণসীমা বাড়াতে কংগ্রেসের অনুমোদন প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কংগ্রেস ও হোয়াইট হাউসের মধ্যে সমঝোতা না হলে সরকারের ঋণ গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে সংকট তৈরি হতে পারে। বর্তমান রাজনৈতিক মেরুকরণের মধ্যে আইনপ্রণেতারা ঋণসীমা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছাতে ব্যর্থ হলে যুক্তরাষ্ট্রের সামনে কৃত্রিম ঋণখেলাপির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে সরকারের আর্থিক দায় পরিশোধ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার পাশাপাশি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারেও বড় ধরনের অস্থিরতা ছড়িয়ে পড়তে পারে। কারণ, মার্কিন সরকারি ঋণপত্র বিশ্ব অর্থব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচিত। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণসংকট শুধু দেশটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজার, বিনিয়োগ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতায়।
অর্থনীতিবিদদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, শক্তিশালী অর্থনৈতিক কাঠামো, ডলারের আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র এখনো তাৎক্ষণিক বিপর্যয় এড়ানোর সক্ষমতা রাখে। তবে দীর্ঘদিন ধরে বাড়তে থাকা ঋণ, সুদ পরিশোধের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং রাজনৈতিক অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সের অর্থনৈতিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সরাসরি একই পরিণতির পূর্বাভাস না হলেও, দুটি দেশের ঋণ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ঋণ নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ এবং রাজনৈতিক সমঝোতা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতিকেও ভবিষ্যতে বড় ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হতে পারে।
সূত্র: সিএনএন



