ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব পেয়েছেন বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট। তবে প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ম্যান্ডেট পেলেও সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা থেকে শুরু করে জোটের শরিকদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরি—সব ক্ষেত্রেই কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারেন তিনি।
টাইমস অব ইসরাইলের তথ্য অনুযায়ী, সরকার গঠনের জন্য আইজেনকটকে একাধিক রাজনৈতিক সমীকরণ মেলাতে হবে। বিশেষ করে আরব দলগুলোর সমর্থন, অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং নিজের জোটের অভ্যন্তরীণ মতবিরোধ তাঁর পরিকল্পনাকে জটিল করে তুলেছে। এর পাশাপাশি রয়েছে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠনের চাপ।
গত ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইসরাইলের পার্লামেন্ট নেসেটের ১২০টি আসনের মধ্যে আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন চার দলের জোট পেয়েছে ৪৮টি আসন। অন্যদিকে নেতানিয়াহুর ডানপন্থি ও ধর্মীয় দলগুলোর জোটের দখলে রয়েছে ৫৩টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন দুই দল পেয়েছে ১৯টি আসন। সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজন অন্তত ৬১ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন।
১. আরব দলগুলোর সমর্থন নিয়ে জটিলতা
আইজেনকটের সামনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সমর্থন কাজে লাগিয়ে সরকার গঠন করা। নির্বাচনে দল দুটি রেকর্ড ১৯টি আসন পেয়েছে। নতুন সরকার গঠনের দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের কাছে তারাই আইজেনকটের পক্ষে সুপারিশ করেছে। তাদের সমর্থন পেলে আইজেনকটের জোটের পক্ষে ৬৭ জন আইনপ্রণেতার সমর্থন পাওয়া সম্ভব।
তবে আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনের বিষয়ে আপত্তি রয়েছে আইজেনকটের জোটের কয়েকটি শরিকের। বিশেষ করে ডানপন্থি নেতা আভিগদর লিবারম্যানের দল ইসরাইল বেইতেনু এমন সরকারের বিরোধিতা করছে। ফলে আরব দলগুলোর সমর্থন পাওয়া গেলেও সেটিকে সরকার গঠনের কাজে লাগাতে গিয়ে জোটের ভেতরেই মতবিরোধ তৈরি হতে পারে।
২. অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা
সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হলো অতি-অর্থোডক্স ইহুদি দল শাস ও ইউনাইটেড তোরাহ জুডাইজমের সমর্থন আদায়। দল দুটির সম্মিলিত আসনসংখ্যা ১৩। আইজেনকটের ৪৮ আসনের জোটের সঙ্গে তাদের যুক্ত করা সম্ভব হলে মোট আসন দাঁড়াবে ৬১—যা সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
কিন্তু এ ক্ষেত্রেও বড় মতপার্থক্য রয়েছে। অতি-অর্থোডক্স দল দুটি ইহুদি তরুণদের বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পক্ষে। অন্যদিকে আইজেনকট ও তাঁর কয়েকজন জোটসঙ্গী সামরিক বাহিনীতে সবার জন্য বাধ্যতামূলক সেবার নীতিতে ছাড় দিতে রাজি নন। ফলে সমঝোতা করা কঠিন হতে পারে।
৩. জোটের শরিকদের মধ্যে মতবিরোধ
সরকার গঠনের কৌশল নিয়ে আইজেনকটের নিজের জোটেও একমত নেই সবাই। লিবারম্যান আরব দলগুলোর সমর্থননির্ভর সংখ্যালঘু সরকার গঠনের বিপক্ষে। তাঁর পছন্দ অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা করে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে আইজেনকট ও তাঁর কয়েকজন মিত্র সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলক দায়িত্ব পালনের প্রশ্নে আপস করতে অনিচ্ছুক। ফলে কোন দলকে সঙ্গে নিয়ে সরকার গঠন করা হবে এবং কোন নীতিতে ছাড় দেওয়া হবে, তা নিয়ে জোটের নেতাদের মধ্যে সমঝোতা জরুরি।
৪. নেতানিয়াহুকে নিয়ে জাতীয় ঐক্যের সরকার
আরেকটি সম্ভাবনা হলো জাতীয় ঐক্যের সরকার গঠন। এ ক্ষেত্রে আইজেনকটের বিরোধী জোটের সঙ্গে নেতানিয়াহুর লিকুদ পার্টি একসঙ্গে সরকারে যেতে পারে। ৪৮ আসনের বিরোধী জোটের সঙ্গে লিকুদের ২৭টি আসন যোগ হলে মোট আসনসংখ্যা হবে ৭৫।
তবে এই পথও সহজ নয়। নির্বাচনি প্রচারে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আইজেনকট। তাই তাঁর পক্ষে নেতানিয়াহুর সঙ্গে একই সরকারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া রাজনৈতিকভাবে কঠিন হতে পারে।
৫. বিরোধী জোট ভাঙার চেষ্টা করতে পারেন নেতানিয়াহু
সরকার গঠনের দায়িত্ব আইজেনকট পেলেও ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা চালাতে পারেন নেতানিয়াহু। তাঁর দল লিকুদ পার্টি এখনো পার্লামেন্টের বৃহত্তম একক দল। আইজেনকট নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে নেতানিয়াহুর সামনে আবারও সেই সুযোগ আসতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে বিরোধী জোটের আইনপ্রণেতাদের নিজের পক্ষে টানার চেষ্টা করতে পারেন তিনি। এতে আইজেনকটের জোটের ঐক্য ধরে রাখার বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
৬. নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সমঝোতা
সরকার গঠনের জন্য আইজেনকট প্রাথমিকভাবে ২৮ দিন সময় পাবেন। প্রয়োজন হলে প্রেসিডেন্ট আরও ১৪ দিন সময় বাড়াতে পারবেন। এই সময়ের মধ্যে জোটসঙ্গীদের সঙ্গে মন্ত্রিসভার পদ বণ্টন, নীতিগত অবস্থান এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে তাঁকে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইজেনকট সরকার গঠনে ব্যর্থ হলে প্রেসিডেন্ট অন্য কোনো আইনপ্রণেতাকে দায়িত্ব দিতে পারেন। শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই সরকার গঠন করতে না পারলে নতুন নির্বাচনের পথ খুলে যেতে পারে। সে পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্বে থাকবেন নেতানিয়াহু।
সব মিলিয়ে আরব দলগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করা, অতি-অর্থোডক্স দলগুলোর সঙ্গে সমঝোতা এবং নিজের জোটের ঐক্য ধরে রাখাই আইজেনকটের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সরকার গঠনের দায়িত্ব পেলেও শেষ পর্যন্ত তিনি নেতানিয়াহুর দীর্ঘদিনের শাসনের অবসান ঘটাতে পারবেন কি না, তা নির্ভর করছে এই ছয়টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার ওপর।



