ইউরোপের বিভিন্ন দেশের আকাশসীমায় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ লক্ষ্য করে ধারাবাহিক বোমা হামলার হুমকিতে বিমান চলাচলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) একাধিক বাণিজ্যিক ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর ফ্রান্স, অস্ট্রিয়া ও বুলগেরিয়াসহ কয়েকটি দেশ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে। এর মধ্যে ফ্রান্সে আয়ারল্যান্ডের বিমান সংস্থা অ্যার লিঙ্গাসের একটি যাত্রীবাহী উড়োজাহাজকে রাফাল ও মিরাজ যুদ্ধবিমানের পাহারায় সামরিক বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করানো হয়।
ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর জানায়, ডাবলিন থেকে রোমগামী অ্যার লিঙ্গাসের এআই৪০২ ফ্লাইটে বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর উড়োজাহাজটির গতিপথ পরিবর্তন করা হয়। এয়ারবাস এ৩২০ মডেলের বিমানটিকে নরম্যান্ডির এভরো-ফভিল সামরিক বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়। এ সময় ফরাসি বিমান ও মহাকাশ বাহিনীর একটি রাফাল যুদ্ধবিমান সেটিকে পাহারা দেয়।
ফরাসি সংবাদমাধ্যম লা মঁদের প্রতিবেদনে বলা হয়, সাঁ-দিজিয়ে বিমানঘাঁটি থেকে স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে রাফালটি উড্ডয়ন করে। পরে এভরো বিমানঘাঁটি থেকে একটি মিরাজ ২০০০-৫ যুদ্ধবিমানও নিরাপত্তা অভিযানে যুক্ত হয়।
উড়োজাহাজটিতে ১৫১ জন যাত্রী ও ছয়জন ক্রু ছিলেন। স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ৫ মিনিটের দিকে এটি এভরো সামরিক বিমানঘাঁটিতে নিরাপদে অবতরণ করে। পরে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ বিশেষজ্ঞরা উড়োজাহাজটিতে তল্লাশি চালালেও কোনো বিস্ফোরক বা সন্দেহজনক বস্তু পাননি। এরপর যাত্রীদের বাসে করে প্যারিসের শার্ল দ্য গল বিমানবন্দরে নেওয়া হয়। সেখান থেকে তাদের রোমে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা হয়।
ফ্রান্সের পাশাপাশি অস্ট্রিয়া, বুলগেরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্রেও নিরাপত্তা সতর্কতা জোরদার করা হয়। অস্ট্রিয়ার আকাশসীমায় হুমকির মুখে পড়া কয়েকটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজকে পাহারা দেয় ইউরোফাইটার যুদ্ধবিমান। বুলগেরিয়ার বিমানবাহিনী তিনটি রায়ানএয়ার উড়োজাহাজের নিরাপত্তায় মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে।
অন্যদিকে, চেক প্রজাতন্ত্রের রাজধানী প্রাগের ভাকলাভ হাভেল বিমানবন্দরে অবতরণ করা চারটি উড়োজাহাজে বোমা হামলার হুমকি পাওয়ার পর তল্লাশি চালানো হয়। একই সময়ে পোল্যান্ডের ওয়ারশর ফ্রেডেরিক শোপাঁ বিমানবন্দরের একটি রানওয়ে নিরাপত্তা পরীক্ষার জন্য সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিনের শেষ নাগাদ ইউরোপে প্রায় ৩০টি যাত্রীবাহী ফ্লাইট বোমার ভুয়া হুমকির কারণে কোনো না কোনোভাবে বিঘ্নিত হয়। তবে ইউরোপীয় বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ সংস্থা ইউরোকন্ট্রোলের হিসাবে, ওই দিন ১৪টি ফ্লাইটে বোমার হুমকির তথ্য পাওয়া যায়। অর্থাৎ হুমকি পাওয়া এবং এর কারণে সরাসরি ফ্লাইট চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
এর ধারাবাহিকতায় শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ফ্রান্সের আকাশসীমায় যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ লক্ষ্য করে আরও চারটি বোমার হুমকি পাওয়ার কথা জানায় দেশটির প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর। উড়োজাহাজগুলো নিরাপদে অবতরণ করে এবং সেগুলোতে তল্লাশি চালানো হয়। তবে কোন কোন ফ্লাইট এসব হুমকির মুখে পড়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি ফরাসি কর্তৃপক্ষ।
একই দিন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরিবহন কমিশনার আপোস্তলোস তজিতজিকোস্তাস জানান, বৃহস্পতিবার ১৪টি এবং শুক্রবার আরও ১১টি বোমার হুমকির ঘটনা সম্পর্কে তারা অবগত হয়েছেন। এসব ঘটনার মধ্যে সরাসরি কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়ার মতো তথ্য তখনো পাওয়া যায়নি। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ইউরোপীয় বিমান চলাচল ও নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের বৈঠকের কথাও জানান তিনি।
এদিকে, ইতালির রোম ও বুলগেরিয়ার সোফিয়া বিমানবন্দরে পাঠানো হুমকিমূলক ইমেইল ঘিরে নতুন করে তদন্ত শুরু হয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব ইমেইলের কয়েকটিতে রাশিয়ায় নিষিদ্ধ উগ্র ডানপন্থী নারীবিদ্বেষী সংগঠন ‘মেল স্টেট’-এর নাম ব্যবহার করে দায় স্বীকারের দাবি করা হয়েছে।
তবে ইমেইলগুলোর প্রকৃত প্রেরক কারা, তাদের সঙ্গে সংগঠনটির কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না কিংবা ইউরোপজুড়ে ধারাবাহিক এসব হুমকির পেছনে কোনো রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ভ্লাদিস্লাভ পোজনিয়াকভও এসব হুমকির সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
শুক্রবার নতুন করে আয়ারল্যান্ডের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আরটিই, যুক্তরাজ্যের স্কাই এবং বুলগেরিয়ার নোভা টিভিও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে। এ ঘটনায় ডাবলিনে আরটিইর কার্যালয় সাময়িকভাবে খালি করা হয়। পরে পুলিশ তল্লাশি চালিয়ে নিরাপদ ঘোষণা করলে কর্মীরা আবার কার্যালয়ে ফিরে যান।
ইউরোপীয় কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এসব হুমকির ঘটনায় কোনো বিস্ফোরক উদ্ধার হয়নি কিংবা হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে ধারাবাহিক হুমকির উৎস এবং এর পেছনে কারা রয়েছে, তা শনাক্তে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি বিবেচনায় ইউরোপের বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তা নজরদারি ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছে।



