চ্যাটজিপিটির দেওয়া পরামর্শ মেনে মৃগী রোগের ওষুধ ধীরে ধীরে কমিয়ে একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার পর এক তরুণীর মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক চ্যাটবটটির নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই তরুণীর বাবা-মা। গত ২৭ অক্টোবর স্থানীয় সময় যুক্তরাষ্ট্রের সান ফ্রান্সিসকো সুপিরিয়র কোর্টে ভুল চিকিৎসাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলাটি করা হয়।
চায়না ওভারসিজ চাইনিজ নেটওয়ার্কের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিহত ওই তরুণীর বয়স ছিল ৩১ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটলে বসবাস করতেন এবং চীনা নাগরিক ছিলেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটির তৈরি করা প্রতিদিনের ওষুধের মাত্রা কমানোর পরিকল্পনা অনুসরণ করে তিনি ধাপে ধাপে মৃগী রোগের ওষুধ সেবন কমান। একপর্যায়ে পুরোপুরি ওষুধ বন্ধ করে দেওয়ার পর তাঁর মৃত্যু হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তরুণীর আদি বাড়ি চীনের জিয়াংসু প্রদেশে। তিনি আগে আমাজনে সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০২১ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে ছুটিতে ছিলেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর এপিলেপসিতে আক্রান্ত ছিলেন ওই তরুণী।
একসময় তাঁর ব্যবহৃত পুরোনো ওষুধ কার্যকারিতা হারালে নতুন ওষুধ গ্রহণ শুরু করেন তিনি। এতে মাসে খিঁচুনির সংখ্যা কয়েকটিতে নেমে আসে। ২০২৩ সাল থেকে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, স্বাস্থ্যবিমা এবং শারীরিক ও মানসিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভাতাসহ বিভিন্ন বিষয়ে নিয়মিত চ্যাটজিপিটির সহায়তা নিতেন তিনি। ২০২৫ সালে প্রতি সপ্তাহে গড়ে দেড় হাজারেরও বেশি বার্তা পাঠিয়েছিলেন এই ব্যবহারকারী।
ওপেনএআইয়ের বক্তব্য
ঘটনাটি নিয়ে ওপেনএআইয়ের মুখপাত্র ড্রু পুতেরি জানিয়েছেন, সংশ্লিষ্ট জিপিটি-ফোরও (GPT-4o) মডেলটি গত ১৩ ফেব্রুয়ারি চ্যাটজিপিটির গ্রাহক অ্যাপ থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁর দাবি, নতুন মডেলটি জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে—এমন পরিস্থিতি শনাক্ত করতে এবং ব্যবহারকারীদের আরও স্পষ্টভাবে পরবর্তী করণীয় জানাতে আগের তুলনায় বেশি সক্ষম।
তিনি আরও জানান, চিকিৎসকদের সঙ্গে সমন্বয় করে পণ্যটির নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাইয়ে নিয়মিত মূল্যায়ন এবং পরীক্ষা চালাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, ‘চ্যাটজিপিটি কখনোই চিকিৎসাসেবার বিকল্প হতে পারে না।’
ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে আগেও মামলা
চিকিৎসাসংক্রান্ত ভুল তথ্য দেওয়ার অভিযোগে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম আইনি পদক্ষেপ নয়। চলতি বছরের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার এক যাজক প্রতিষ্ঠানটির পাশাপাশি স্যাম অল্টম্যানের বিরুদ্ধেও মামলা করেন। তাঁর অভিযোগ, চ্যাটজিপিটির দেওয়া ভুল তথ্যের কারণে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা নিতে দেরি হয়। এতে তাঁর ফুসফুসে রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর শারীরিক জটিলতা তৈরি হয়। ওই মামলাকে চিকিৎসাগত ভুল তথ্যের কারণে গুরুতর ক্ষতির অভিযোগে বিশ্বের প্রথম মামলা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
এদিকে চলতি মাসের শুরুতে সিনহুয়া নিউজ এজেন্সির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের আটটি অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল গত ১৪ তারিখ নিজ নিজ রাজ্যের আদালতে ওপেনএআইয়ের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের ভুল পথে পরিচালিত করছে, অপ্রাপ্তবয়স্কদের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে ফেলছে এবং আইন লঙ্ঘন করছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলদের কার্যালয় থেকে প্রকাশিত নথিতে বলা হয়েছে, চ্যাটজিপিটিকে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে এটি ব্যবহারকারীদের অতিরিক্ত প্রশংসা ও সমর্থন জানায়। মানুষের আবেগ অনুকরণের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের আস্থা ও নির্ভরশীলতা বাড়ানোর প্রবণতাও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার নথিতে আরও দাবি করা হয়, চ্যাটজিপিটি কখনো ব্যবহারকারীর ভুল বা বিভ্রান্তিকর ধারণাকে আরও জোরালো করতে পারে। এমনকি স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ চিকিৎসা পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি কিছু পরিস্থিতিতে নিজেকে কিংবা অন্যকে ক্ষতি করার মতো আচরণেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এসব অভিযোগের জবাবে ওপেনএআই জানিয়েছে, বিভিন্ন বয়সী ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাদের পণ্যে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তাসংক্রান্ত পদক্ষেপ আরও উন্নত করতে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি।



