যক্ষ্মা বা টিবি একটি সংক্রামক রোগ হলেও এটি শুধু ফুসফুসেই সীমাবদ্ধ থাকে না। লিম্ফ নোড, হাড়, মেরুদণ্ড এমনকি মস্তিষ্কেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এই রোগ। বিশেষ করে শিশু, এইচআইভিতে আক্রান্ত ব্যক্তি, ডায়াবেটিস রোগী এবং আগে যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছেন—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি বেশি হতে পারে। রোগের লক্ষণ শুরুতে অস্পষ্ট থাকায় অনেক সময় শনাক্ত করতেও দেরি হয়।
বিশ্বজুড়ে শিশুদের মধ্যে যক্ষ্মা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা। রোগটি সময়মতো শনাক্ত না হলে এবং যথাযথ চিকিৎসা না পেলে গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, অকারণে ওজন কমে যাওয়া কিংবা শরীরের কোনো অংশে ব্যথাহীন ফোলা দেখা দিলে বিষয়টি অবহেলা করা উচিত নয়।
১. লিম্ফ নোডের যক্ষ্মা
লিম্ফ নোড বা লসিকাগ্রন্থির যক্ষ্মায় সাধারণত ঘাড় কিংবা বগলের কাছে গ্রন্থি ফুলে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এই ফোলা ব্যথাহীন হয় বলে রোগীরা শুরুতে গুরুত্ব দেন না। তবে দীর্ঘদিন ধরে গ্রন্থি ফুলে থাকা বা ফোলার আকার বাড়তে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
এ ধরনের ফোলা যক্ষ্মা ছাড়াও অন্যান্য সংক্রমণ বা রোগের কারণে হতে পারে। তাই শুধু লক্ষণ দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না; প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে হয়।
২. হাড় ও মেরুদণ্ডের যক্ষ্মা
যক্ষ্মার জীবাণু হাড় কিংবা মেরুদণ্ডে সংক্রমণ ঘটালে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা হতে পারে। বিশেষ করে পিঠের ব্যথাকে অনেকে সাধারণ পেশির ব্যথা মনে করে অবহেলা করেন। কিন্তু ব্যথা দীর্ঘদিন স্থায়ী হলে বা ক্রমে বাড়তে থাকলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
সম্ভাব্য লক্ষণগুলো হলো—
- দীর্ঘদিন ধরে পিঠ, হাড় বা জয়েন্টে ব্যথা
- জ্বর ও অকারণে ওজন কমে যাওয়া
- ক্ষুধামন্দা ও দুর্বলতা
- মেরুদণ্ডের গঠন পরিবর্তন বা বাঁকা হয়ে যাওয়া
সময়মতো চিকিৎসা না হলে মেরুদণ্ডের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। গুরুতর ক্ষেত্রে হাত-পায়ের শক্তি কমে যাওয়া, এমনকি পক্ষাঘাতের মতো জটিলতাও দেখা দিতে পারে। হাড় ও মেরুদণ্ডের যক্ষ্মায় চিকিৎসার মেয়াদ রোগের ধরন, আক্রান্ত স্থানের অবস্থা এবং চিকিৎসায় সাড়ার ওপর নির্ভর করে; অনেক ক্ষেত্রে চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি হয়।
৩. মস্তিষ্কের যক্ষ্মা
মস্তিষ্ক ও এর আবরণে যক্ষ্মার সংক্রমণ হলে তাকে টিবি মেনিনজাইটিস বলা হয়। এটি যক্ষ্মার গুরুতর একটি ধরন, যা দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতী হতে পারে। শিশুদের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন।
যেসব লক্ষণ দেখা দিতে পারে—
- তীব্র বা ক্রমশ বাড়তে থাকা মাথাব্যথা
- জ্বর ও ঘাড় শক্ত হয়ে যাওয়া
- খিঁচুনি
- আচরণে অস্বাভাবিকতা, বিভ্রান্তি বা চেতনা কমে যাওয়া
শিশুদের ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক নিস্তেজতা, খেতে না চাওয়া কিংবা স্বাভাবিক আচরণে পরিবর্তনও দেখা যেতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। দেরি হলে মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষতি কিংবা মৃত্যুর ঝুঁকি থাকে।
ফুসফুসের বাইরের যক্ষ্মা শনাক্তে দেরি হয় কেন?
যক্ষ্মা সাধারণত ফুসফুসে বেশি দেখা গেলেও শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও সংক্রমণ ঘটাতে পারে। ফুসফুসের যক্ষ্মা আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে ছড়াতে পারে। অন্যদিকে, হাড় বা লসিকাগ্রন্থির মতো স্থানে সীমাবদ্ধ যক্ষ্মা সাধারণত একইভাবে অন্যের মধ্যে ছড়ায় না। তবে একই ব্যক্তির ফুসফুসেও সংক্রমণ আছে কি না, তা মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ।
ফুসফুসের বাইরের যক্ষ্মা শনাক্ত করা অনেক সময় কঠিন হয়। এসব ক্ষেত্রে কাশি বা কফ না থাকায় প্রচলিত কফ পরীক্ষার সুযোগ নাও থাকতে পারে। আবার লক্ষণগুলো অন্য সংক্রমণ, ক্যানসার কিংবা কিছু প্রদাহজনিত রোগের সঙ্গে মিলে যেতে পারে। আক্রান্ত অঙ্গের ওপর নির্ভর করে চিকিৎসক আল্ট্রাসনোগ্রাম, সিটি স্ক্যান, বায়োপসি বা অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।
তবে সব রোগীর সিটি স্ক্যান বা বায়োপসি প্রয়োজন হয় না। উপসর্গ, শারীরিক পরীক্ষা ও প্রাথমিক পরীক্ষার ফল বিবেচনা করে চিকিৎসক পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করেন।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন—
- শরীরের কোনো অংশে দীর্ঘদিন ধরে ব্যথাহীন ফোলা
- দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ফিরে আসা জ্বর
- রাতে অতিরিক্ত ঘাম হওয়া
- অকারণে ওজন কমে যাওয়া
- ক্ষুধামন্দা ও দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা
- দীর্ঘদিন ধরে হাড়, পিঠ বা জয়েন্টে ব্যথা, যা সাধারণ চিকিৎসায় কমছে না
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই যক্ষ্মা হয়েছে, এমন নয়। সঠিক রোগ নির্ণয়ের জন্য চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
সময়মতো পরীক্ষা ও চিকিৎসাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
যক্ষ্মা নিরাময়যোগ্য রোগ। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারিত ওষুধ নিয়মিত ও সম্পূর্ণ মেয়াদে গ্রহণ করলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় সম্ভব। নিজে থেকে ওষুধ শুরু করা, মাঝপথে বন্ধ করা কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধের মাত্রা পরিবর্তন করা উচিত নয়। এতে চিকিৎসা ব্যর্থ হওয়া ও ওষুধ-প্রতিরোধী যক্ষ্মার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিশেষ করে শিশু, ডায়াবেটিস রোগী এবং রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কম—এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সন্দেহজনক লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। শরীরের পরিবর্তনকে সামান্য সমস্যা ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে সময়মতো পরীক্ষা করানোই যক্ষ্মার জটিলতা প্রতিরোধের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।



