১৫ বছরের ফি দিয়ে ২০ বছরের লাইসেন্স চান অপারেটররা, কিস্তি ৮টি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করার প্রস্তাবও; সরকারের রাজস্ব কমতে পারে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি
মোবাইল ফোনের তরঙ্গ নবায়নে বেসরকারি অপারেটরদের জন্য একের পর এক আর্থিক সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। আগের তুলনায় তরঙ্গের দাম কমানোর পাশাপাশি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ বাড়ানোর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। এমনকি ১৫ বছরের পরিবর্তে ২০ বছরের জন্য লাইসেন্স নবায়নের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। এর মধ্যেই নিয়মিত বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি তুলেছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অপারেটরদের আর্থিক সুবিধা দিতে গিয়ে সরকারের রাজস্ব আদায় এবং গ্রাহকস্বার্থ যেন উপেক্ষিত না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার বিনিময়ে সেবার মানোন্নয়ন, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা থাকা প্রয়োজন।
আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এই তরঙ্গ নবায়নকে কেন্দ্র করেই দাম, লাইসেন্সের মেয়াদ ও কিস্তির শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। বিটিআরসির প্রস্তাবিত সুবিধার পরও অপারেটরদের নতুন নতুন দাবি ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে—গ্রাহকদের প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত না করেই কি তারা আরও আর্থিক সুবিধা পেতে যাচ্ছে?
গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করার দাবি
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল অপারেটরদের শুধু আর্থিক ছাড় ও সুবিধা দিলেই চলবে না; গ্রাহকদের উন্নত সেবা দেওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের নেটওয়ার্ক, ঘন ঘন কলড্রপ এবং ইন্টারনেটের ধীরগতির কারণে গ্রাহকদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তাই তরঙ্গ নবায়নে সুবিধা দেওয়ার আগে অপারেটরদের কাছ থেকে সেবার মানোন্নয়নে সুস্পষ্ট অঙ্গীকার আদায় করা প্রয়োজন।
মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, দেশের মোবাইল অপারেটরদের কাছে গ্রাহকরা অনেকটা জিম্মি হয়ে পড়েছেন। অপারেটররা সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা পেলেও গ্রাহকদের মানসম্মত সেবা দিতে পারছেন না।
তিনি বলেন, তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার আগে গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে। অপারেটররা বিপুল মুনাফা করলেও গ্রাহকদের কলড্রপ, দুর্বল নেটওয়ার্ক ও ধীরগতির ইন্টারনেটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তরঙ্গের দাম কমানো এবং কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা দেওয়া হলে তার সুফল গ্রাহকদেরও দিতে হবে।
মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করার শর্ত দিতে হবে। এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে দেওয়া ছাড় প্রত্যাহারসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
গবেষণার ভিত্তিতে তরঙ্গের দাম নির্ধারণ
বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জুয়েল যুগান্তরকে বলেন, প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পেকট্রামের মূল্য ও লাইসেন্সের মেয়াদসংক্রান্ত প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি জানান, অপারেটরদের পক্ষ থেকে এমটব চিঠি দিয়ে তাদের দাবি-দাওয়া জানাচ্ছে। সংগঠনটি নিজেদের দাবি জানাতেই পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
আগের তুলনায় দাম কমানোর প্রস্তাব
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ আগামী ১০ নভেম্বর শেষ হচ্ছে। এসব তরঙ্গ নবায়নের জন্য বিটিআরসি গবেষণার ভিত্তিতে নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। নির্ধারিত দাম চূড়ান্ত করার সুপারিশ জানিয়ে গত ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠায় সংস্থাটি।
প্রস্তাবে ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৯৮ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। আগের তুলনায় এসব দামে গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়ের সুযোগ রয়েছে।
এর পাশাপাশি কিস্তিতে তরঙ্গের মূল্য পরিশোধের সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও করা হয়। কিন্তু এসব সুবিধাতেও সন্তুষ্ট হয়নি বেসরকারি মোবাইল অপারেটরগুলো।
অপারেটরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৫ অক্টোবর পাঠানো প্রস্তাব সংশোধন করে ২২ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে নতুন প্রস্তাব পাঠায় বিটিআরসি। সংশোধিত প্রস্তাবে স্পেকট্রাম লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর করার পাশাপাশি মূল্য পরিশোধের কিস্তি আটটি থেকে বাড়িয়ে ১২টি করার সুপারিশ করা হয়।
এবার বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি
এরপরও নতুন দাবি তুলেছে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন এমটব। তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হওয়ার প্রাক্কালে নবায়ন ফি কমানো, মূল্য পরিশোধের শর্ত আরও শিথিল করা এবং বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
গত ২৫ অক্টোবর বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীকে এ বিষয়ে চিঠি দেন এমটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার।
চিঠিতে সংগঠনটি ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের লাইসেন্স মেয়াদ দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের মেয়াদ ২০ বছর করার পাশাপাশি তরঙ্গ নবায়নে বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের প্রস্তাবও দিয়েছে।
এতে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় এবং অপারেটরদের আর্থিক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টি সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এমটবের দাবি মেনে নেওয়া হলে সরকারের রাজস্ব আদায়ে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে।
বিটিআরসির প্রস্তাবিত মূল্যকাঠামোর পরিবর্তে ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়া হলে শুধু স্পেকট্রাম ফি থেকেই সরকারের সম্ভাব্য আয় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের ধারণা।
কিস্তির সুবিধা বাড়ানোর পেছনে কী যুক্তি?
বিটিআরসির সর্বশেষ ৩১২তম কমিশন সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে স্পেকট্রাম বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তির সুবিধা রাখার প্রস্তাব করা হয়।
সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের মেয়াদ ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত থাকায় প্রাথমিক প্রস্তাবে ১৫ বছরের পরিবর্তে অবশিষ্ট ১২ বছর চার মাসের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ এবং আটটি সমান কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল।
প্রস্তাব অনুযায়ী, নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে প্রথম কিস্তি এবং পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধ করতে হতো। বাকি ছয়টি কিস্তি পরিশোধের জন্য পরবর্তী বছরগুলো নির্ধারণের প্রস্তাব ছিল।
তবে পরবর্তী সময়ে এসব শর্ত আরও নমনীয় করার প্রস্তাব কী বিবেচনায় আনা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে আটটি কিস্তির পরিবর্তে ১২টি কিস্তি এবং পরিশোধের মেয়াদ আরও বাড়ানোর সুপারিশের যৌক্তিকতা স্পষ্ট করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুবিধার বিনিময়ে সেবার নিশ্চয়তা কোথায়?
মোবাইল অপারেটরদের জন্য তরঙ্গ নবায়নে আর্থিক সুবিধা দেওয়া হলে তার বিনিময়ে গ্রাহকদের কী ধরনের উন্নত সেবা নিশ্চিত করা হবে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। তরঙ্গের মূল্য কমানো, দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স এবং কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ অপারেটরদের আর্থিক চাপ কমাতে পারে। তবে এসব সুবিধা গ্রাহকদের সেবার মানে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে, তা নির্ভর করবে কার্যকর শর্ত ও তদারকির ওপর।
বিশেষজ্ঞদের মতে, তরঙ্গ নবায়নের সঙ্গে নেটওয়ার্কের আওতা বাড়ানো, প্রত্যন্ত অঞ্চলে নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ নিশ্চিত করা, কলড্রপের হার কমানো, ইন্টারনেটের গতি ও মান উন্নত করা এবং গ্রাহকদের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়গুলো যুক্ত করা উচিত। পাশাপাশি সেবার মান পরিমাপের স্বচ্ছ সূচক নির্ধারণ করে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ এবং শর্ত ভঙ্গের ক্ষেত্রে জরিমানা বা ছাড় প্রত্যাহারের ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, তরঙ্গ নবায়নে অপারেটরদের আর্থিক সুবিধা দেওয়া হবে কি না, তা সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তের বিষয়। তবে এ সিদ্ধান্তে রাষ্ট্রের রাজস্ব স্বার্থ ও গ্রাহকদের অধিকারকে সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। কয়েক হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্বের প্রশ্নের পাশাপাশি কোটি কোটি গ্রাহকের দৈনন্দিন যোগাযোগসেবার মানও বিবেচনায় নিতে হবে।
সরকার যদি অপারেটরদের দাবির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তবে সেই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা, আর্থিক প্রভাব এবং গ্রাহকস্বার্থ রক্ষায় গৃহীত শর্তগুলো জনসমক্ষে স্পষ্ট করা প্রয়োজন। অন্যথায় আর্থিক ছাড়ের সুফল অপারেটরদের কাছেই সীমাবদ্ধ থাকবে, আর নিম্নমানের সেবার বোঝা বহন করতে হবে গ্রাহকদেরই।



