tanaka
প্রচ্ছদজাতীয়তরঙ্গ নবায়নে হাজার কোটি টাকার ছাড়, গ্রাহকের ভাগ্যে নিম্নমানের নেটওয়ার্ক ও চড়া...

তরঙ্গ নবায়নে হাজার কোটি টাকার ছাড়, গ্রাহকের ভাগ্যে নিম্নমানের নেটওয়ার্ক ও চড়া ইন্টারনেট

তরঙ্গের দাম কমছে, বাড়ছে কিস্তির সংখ্যা, দীর্ঘ হচ্ছে লাইসেন্সের মেয়াদ—মোবাইল অপারেটরদের জন্য একের পর এক আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব দিচ্ছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এরপরও সন্তুষ্ট নয় বেসরকারি অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব)। এবার ১৫ বছরের নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের লাইসেন্স, দীর্ঘমেয়াদি কিস্তি এবং বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। অন্যদিকে, গ্রাহকদের অভিযোগের তালিকায় বছরের পর বছর শীর্ষে রয়েছে মোবাইল সেবার মান। প্রশ্ন উঠেছে, অপারেটরদের জন্য এত সুবিধার আয়োজন থাকলেও গ্রাহক কেন পাচ্ছেন না মানসম্মত নেটওয়ার্ক, নিরবচ্ছিন্ন কলসেবা ও সাশ্রয়ী ইন্টারনেট?

আগামী ১০ নভেম্বর গ্রামীণফোন, রবি ও বাংলালিংকের হাতে থাকা মোট ৭৯ দশমিক ২ মেগাহার্টজ তরঙ্গের মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এসব তরঙ্গ নবায়নকে কেন্দ্র করে মূল্য নির্ধারণ ও পরিশোধের শর্তে বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। প্রথম প্রস্তাবে তরঙ্গের দাম আগের তুলনায় গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ কমানোর সুপারিশ করা হয়। পরে অপারেটরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর এবং কিস্তির সংখ্যা আট থেকে বাড়িয়ে ১২ করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।

তবে এত সুবিধার পরও নতুন দাবি তুলেছে অপারেটরদের সংগঠন এমটব। তাদের প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে সরকারের সম্ভাব্য রাজস্ব আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাবে, ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়া হলে তরঙ্গ ফি বাবদ সরকারের সম্ভাব্য আয় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে।

অন্যদিকে, গ্রাহকদের অভিযোগের চিত্র বলছে, আর্থিক সুবিধা ও ব্যবসায়িক সুযোগ বাড়লেও সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ কাটছে না। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বিটিআরসিতে মোবাইল সেবা নিয়ে জমা পড়া ১১ হাজার ৬৬৭টি অভিযোগের মধ্যে ৪ হাজার ১৬২টিই ছিল সেবার মানসংক্রান্ত। অর্থাৎ, মোট অভিযোগের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে নেটওয়ার্ক ও সেবার মান নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরঙ্গের দাম কমানো কিংবা কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়ার সুফল শুধু অপারেটরদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। এসব সুবিধার বিপরীতে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো, ডাটার গতি বাড়ানো এবং সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার মতো শর্ত থাকা প্রয়োজন। অন্যথায় রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবহারের সুযোগ বাড়লেও সাধারণ গ্রাহকের দুর্ভোগ কমার নিশ্চয়তা থাকবে না।

একের পর এক ছাড়, তবু নতুন দাবি

বিটিআরসি প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে তরঙ্গের দাম নির্ধারণ করেছে। নির্ধারিত মূল্য চূড়ান্ত করার সুপারিশ জানিয়ে গত ১৫ অক্টোবর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে চিঠি পাঠায় সংস্থাটি। এতে ১৫ বছরের জন্য প্রতি মেগাহার্টজ তরঙ্গের দাম ৯০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ২৩৭ কোটি টাকা, ১৮০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৯৮ কোটি টাকা এবং ২১০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে ১৭২ কোটি টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়। আগের তুলনায় এসব দাম গড়ে সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ শতাংশ কম।

এর পাশাপাশি তরঙ্গের মূল্য কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখার প্রস্তাবও দেওয়া হয়। কিন্তু অপারেটরদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২২ অক্টোবর প্রস্তাবটি সংশোধন করে আবার ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠায় বিটিআরসি। সংশোধিত প্রস্তাবে লাইসেন্সের মেয়াদ ১৫ বছর থেকে বাড়িয়ে ২০ বছর এবং কিস্তির সংখ্যা আট থেকে বাড়িয়ে ১২ করার সুপারিশ করা হয়।

এরপরও সন্তুষ্ট হয়নি অপারেটররা। গত ২৫ অক্টোবর বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারীকে চিঠি দেন এমটবের মহাসচিব লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার। চিঠিতে সংগঠনটি ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত মূল্যেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়ার দাবি জানায়। একই সঙ্গে কিস্তির পরিশোধকাল ২০ বছর করা এবং তরঙ্গ নবায়নে বার্ষিক চার্জ প্রত্যাহারেরও দাবি জানানো হয়।

অর্থাৎ, তরঙ্গের দাম কমানো ও কিস্তির সংখ্যা বাড়ানোর প্রস্তাবের পরও আরও দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সুবিধা চাইছে অপারেটররা। এতে সরকারের রাজস্ব স্বার্থ এবং অপারেটরদের ব্যবসায়িক সুবিধার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

রাজস্ব আয় কমার আশঙ্কা

সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, বিটিআরসির প্রস্তাবিত মূল্যকাঠামোর পরিবর্তে ১৫ বছরের জন্য নির্ধারিত দামেই ২০ বছরের লাইসেন্স দেওয়া হলে তরঙ্গ ফি বাবদ সরকারের সম্ভাব্য আয় ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কমতে পারে।

তরঙ্গ মোবাইল টেলিযোগাযোগ সেবার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এর ব্যবহার ও বরাদ্দের বিপরীতে সরকার রাজস্ব পায়। ফলে তরঙ্গের মূল্য নির্ধারণ, লাইসেন্সের মেয়াদ এবং অর্থ পরিশোধের শর্ত শুধু অপারেটরদের ব্যবসায়িক স্বার্থের বিষয় নয়; এর সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব ও গ্রাহকসেবার মানও সম্পর্কিত।

বিটিআরসির সর্বশেষ ৩১২তম কমিশন সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে সরকারের পূর্বানুমোদনক্রমে সর্বোচ্চ ১০টি কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রেও কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের প্রস্তাব রাখা হয়।

সংশ্লিষ্ট লাইসেন্সের মেয়াদ ২০৩৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত থাকায় প্রাথমিক প্রস্তাবে ১৫ বছরের পরিবর্তে অবশিষ্ট ১২ বছর চার মাসের জন্য তরঙ্গ বরাদ্দ এবং আটটি সমান কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের কথা বলা হয়েছিল। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম কিস্তি নবায়নের নোটিশ পাওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে, দ্বিতীয় কিস্তি পরবর্তী ১৮০ দিনের মধ্যে এবং বাকি ছয়টি কিস্তি পরবর্তী বছরগুলোতে পরিশোধ করার কথা ছিল।

পরবর্তী সময়ে এসব শর্ত আরও নমনীয় করার প্রস্তাব সামনে আসে। তবে শর্ত পরিবর্তনের যৌক্তিকতা, এর আর্থিক প্রভাব এবং গ্রাহকসেবায় সম্ভাব্য সুফল কতটা নিশ্চিত হবে—এসব বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গ্রাহকসেবায় উন্নতি কোথায়?

মোবাইল অপারেটরদের জন্য আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর আলোচনা চললেও গ্রাহকদের ভোগান্তির চিত্র ভিন্ন। বিটিআরসির ২০২৫-২৬ অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত মোবাইল সেবা নিয়ে ২৩টি ক্যাটাগরিতে মোট ১১ হাজার ৬৬৭টি অভিযোগ জমা পড়ে।

এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ১৬২টি অভিযোগ ছিল সেবার মান বা ‘কোয়ালিটি অব সার্ভিস’ নিয়ে। এ ছাড়া বিবিধ বিষয়ে ১ হাজার ৩৪৩টি, মূল্য সংযোজন সেবা বা ভ্যাস নিয়ে ৯২৮টি, ডাটার গতি নিয়ে ৭৩৬টি এবং কল ও এসএমএস-সংক্রান্ত বিষয়ে ৫৩৯টি অভিযোগ জমা পড়ে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, এসব অভিযোগের মধ্যে ১১ হাজার ৩৬২টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে। অনিষ্পন্ন রয়েছে ৩০৫টি।

এর আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মোবাইল সেবা নিয়ে ১১ হাজার ৪২৭টি অভিযোগ জমা পড়েছিল। এর মধ্যে নিষ্পত্তি করা হয় ১০ হাজার ৩১১টি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১১ হাজার ২২৫টি অভিযোগের বিপরীতে নিষ্পত্তি হয়েছিল ৮ হাজার ৯২০টি।

অর্থাৎ, টানা তিন অর্থবছর ধরেই মোবাইল সেবা নিয়ে অভিযোগের সংখ্যা ১১ হাজারের বেশি। প্রতিবারই অভিযোগের তালিকায় শীর্ষে ছিল সেবার মান। এই পরিসংখ্যান গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নে আরও কার্যকর নজরদারি ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।

‘গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করেই ছাড় দিতে হবে’

মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, “আমাদের দেশে মোবাইল অপারেটরদের কাছে গ্রাহকরা একপ্রকার জিম্মি। অপারেটররা সরকারের কাছ থেকে নানা সুযোগ-সুবিধা নিলেও গ্রাহকদের নিম্নমানের সেবা দিচ্ছে। তরঙ্গ নবায়নে ছাড় দেওয়ার আগে গ্রাহকস্বার্থ নিশ্চিত করতে হবে।”

তিনি বলেন, অপারেটররা বিপুল মুনাফা করলেও গ্রাহকদের কলড্রপ, দুর্বল নেটওয়ার্ক ও ধীরগতির ইন্টারনেটের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তরঙ্গের দাম কমানো এবং কিস্তিতে মূল্য পরিশোধের সুবিধা দেওয়া হলে তার সুফল গ্রাহকদেরও দিতে হবে।

মহিউদ্দিন আহমেদের মতে, নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, কলড্রপ কমানো এবং সাশ্রয়ী দামে মানসম্মত ইন্টারনেট নিশ্চিত করার শর্ত আরোপ করা প্রয়োজন। এসব শর্ত পূরণে ব্যর্থ হলে ছাড় প্রত্যাহারসহ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।

সিদ্ধান্ত সরকারের হাতে

বিটিআরসির স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান জুয়েল যুগান্তরকে বলেন, প্রথমবারের মতো গবেষণার ভিত্তিতে স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণ করা হয়েছে। স্পেকট্রামের দাম ও লাইসেন্সের মেয়াদসংক্রান্ত প্রস্তাব ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। সরকার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, অপারেটরদের পক্ষ থেকে এমটব চিঠি দিয়ে তাদের দাবি-দাওয়া জানিয়েছে। তারা নিজেদের দাবি জানাতেই পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।

এদিকে, অপারেটরদের দাবির বিষয়ে বক্তব্য জানতে এমটবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সংগঠনটির পক্ষ থেকে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ছাড়ের পাশাপাশি জবাবদিহিও জরুরি

তরঙ্গ নবায়ন ঘিরে মূল্য কমানো, দীর্ঘমেয়াদি লাইসেন্স ও কিস্তিতে অর্থ পরিশোধের সুযোগ—সব মিলিয়ে মোবাইল অপারেটরদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক সুবিধার প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। তবে এসব সুবিধার বিনিময়ে গ্রাহক কী পাবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, তরঙ্গের মূল্য ও লাইসেন্সের শর্ত চূড়ান্ত করার সময় শুধু অপারেটরদের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করলেই হবে না; গ্রাহকসেবার মানোন্নয়নকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ, নির্ধারিত মান বজায় রাখা, কলড্রপ ও ডাটার গতিসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান এবং অভিযোগ নিষ্পত্তিতে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কারণ, তরঙ্গ নবায়নে ছাড়ের উদ্দেশ্য যদি টেলিযোগাযোগ খাতে বিনিয়োগ ও সেবার উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা হয়, তবে সেই সুবিধার প্রতিফলন গ্রাহকের অভিজ্ঞতায়ও দেখা উচিত। রাষ্ট্রীয় রাজস্বের স্বার্থ রক্ষা এবং সাধারণ মানুষের সাশ্রয়ী, নির্ভরযোগ্য ও মানসম্মত মোবাইল সেবা নিশ্চিত করার মধ্যেই এ সিদ্ধান্তের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত।