tanaka
প্রচ্ছদলাইফস্টাইলস্ট্রোক কী, কেন হয়? লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি

স্ট্রোক কী, কেন হয়? লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া জরুরি

একজন মানুষ স্বাভাবিকভাবে কথা বলছিলেন। হঠাৎ তাঁর কথা জড়িয়ে গেল, মুখের এক পাশ বেঁকে গেল কিংবা হাত থেকে পড়ে গেল চায়ের কাপ। পরিবারের কেউ হয়তো ভাবলেন, দুর্বলতা থেকে এমন হয়েছে, একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এমন পরিস্থিতিতে অপেক্ষা করা হতে পারে বিপজ্জনক। এগুলো স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে, আর স্ট্রোকের চিকিৎসায় প্রতিটি মিনিটই গুরুত্বপূর্ণ।

আজ ২৯ অক্টোবর, বিশ্ব স্ট্রোক দিবস। ২০২৬ সালের বিশ্ব স্ট্রোক সচেতনতা প্রচারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে স্ট্রোকের লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নেওয়ার ওপর। মূল বার্তা—‘প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ’। কারণ, বিপদের মুহূর্তে দ্রুত ও সঠিক সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবন বাঁচাতে এবং দীর্ঘমেয়াদি অক্ষমতার ঝুঁকি কমাতে পারে।

স্ট্রোক কী এবং কেন হয়?

মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেলে অথবা মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে স্ট্রোক হয়। রক্তনালি বন্ধ হয়ে সৃষ্ট স্ট্রোককে বলা হয় ইস্কেমিক স্ট্রোক। অন্যদিকে, রক্তনালি ফেটে রক্তক্ষরণ হলে তাকে বলা হয় হেমোরেজিক স্ট্রোক।

দুই ধরনের স্ট্রোকই জরুরি চিকিৎসার বিষয়। স্ট্রোক মূলত মস্তিষ্কের রোগ; এটি হার্ট অ্যাটাকের মতো নয়। তাই লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পাশাপাশি স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্ট্রোকের লক্ষণ চিনবেন যেভাবে

স্ট্রোকের লক্ষণ সাধারণত হঠাৎ দেখা দেয়। সহজে মনে রাখার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত হয় ‘FAST’ পদ্ধতি।

  • F—Face (মুখ): আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসতে বলুন। মুখের এক পাশ কি বেঁকে যাচ্ছে বা ঝুলে পড়ছে?
  • A—Arms (হাত): দুই হাত তুলতে বলুন। একটি হাত কি তুলতে পারছেন না, অথবা তুললেও নিচে নেমে যাচ্ছে?
  • S—Speech (কথা): কথা কি জড়িয়ে যাচ্ছে, অস্বাভাবিক শোনাচ্ছে কিংবা সহজ বাক্য বলতে সমস্যা হচ্ছে?
  • T—Time (সময়): এসব লক্ষণের যেকোনো একটি দেখা দিলেই দেরি না করে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিন। সব লক্ষণ একসঙ্গে দেখা দেওয়ার অপেক্ষা করবেন না।

এ ছাড়া হঠাৎ দৃষ্টিশক্তির পরিবর্তন, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে যাওয়া, ভারসাম্য হারানো এবং অস্বাভাবিক তীব্র মাথাব্যথাও স্ট্রোকের সতর্কসংকেত হতে পারে। স্ট্রোকের সময় সব ক্ষেত্রে ব্যথা হয় না। তাই ব্যথা না থাকলেও বিপদ নেই—এমন ধারণা করা ঠিক নয়।

স্ট্রোক সন্দেহ হলে প্রথমেই যা করবেন

স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত স্থানীয় জরুরি সেবায় যোগাযোগ করুন এবং সম্ভব হলে অ্যাম্বুলেন্সের সাহায্য নিন। রোগীকে নিজে গাড়ি চালাতে দেবেন না। লক্ষণ কখন শুরু হয়েছে, তা লিখে রাখুন। সময়টি জানা না থাকলে রোগীকে সর্বশেষ কখন সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা গেছে, সেই তথ্য চিকিৎসককে জানান।

রোগীকে পানি, খাবার কিংবা মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। স্ট্রোকের কারণে গিলতে সমস্যা হলে খাবার বা পানি শ্বাসনালিতে ঢুকে যেতে পারে। একইভাবে চিকিৎসকের নির্দেশ ছাড়া অ্যাসপিরিন দেবেন না। কারণ, সব স্ট্রোক রক্ত জমাট বাঁধার কারণে হয় না; কোনো কোনো ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ ঘটে, যেখানে এ ধরনের ওষুধ ক্ষতি বাড়াতে পারে।

লক্ষণ কমে গেলেও নিশ্চিন্ত হওয়ার সুযোগ নেই

কখনো কখনো কয়েক মিনিটের মধ্যে কথা স্বাভাবিক হয়ে যায় কিংবা হাতের দুর্বলতা কমে আসে। এতে অনেকে মনে করেন, বিপদ কেটে গেছে এবং হাসপাতালে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এমন ঘটনা ক্ষণস্থায়ী ইস্কেমিক অ্যাটাক বা টিআইএর লক্ষণ হতে পারে, যা ভবিষ্যতে বড় ধরনের স্ট্রোকের সতর্কবার্তা হতে পারে।

বাড়িতে বসে টিআইএ ও পূর্ণাঙ্গ স্ট্রোকের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই লক্ষণ সেরে গেলেও দ্রুত চিকিৎসকের মূল্যায়ন নেওয়া জরুরি।

দ্রুত হাসপাতালে নিলে কী উপকার হয়?

হাসপাতালে রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়নের পাশাপাশি সিটি স্ক্যান বা এমআরআইয়ের মতো পরীক্ষার মাধ্যমে স্ট্রোকের ধরন নির্ধারণ করা হতে পারে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ কিংবা বিশেষ পদ্ধতিতে জমাট অপসারণের চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। তবে রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোকের চিকিৎসা ভিন্ন।

কোন চিকিৎসা দেওয়া যাবে, তা নির্ভর করে স্ট্রোকের ধরন, রোগীর শারীরিক অবস্থা, পরীক্ষার ফলাফল এবং লক্ষণ শুরুর পর কতটা সময় পেরিয়েছে—এসব বিষয়ের ওপর। এ কারণে দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো চিকিৎসার সুযোগ বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দেরি হয়ে গেছে মনে হলেও হাসপাতালে যাওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত নয়। লক্ষণ নিয়ে বাড়িতে অপেক্ষা করার পরিবর্তে যত দ্রুত সম্ভব জরুরি চিকিৎসা নেওয়াই সঠিক সিদ্ধান্ত।

যেসব অভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে পারে

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, ধূমপান, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই প্রতিরোধের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত স্বাস্থ্যপরিচর্যা ও জীবনযাপনে ইতিবাচক পরিবর্তন।

রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা করা, চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ, তামাক বর্জন, খাবারে লবণের পরিমাণ কমানো, সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শরীরচর্চা ঝুঁকি কমাতে সহায়ক। হৃদ্‌যন্ত্রের অনিয়মিত স্পন্দনসহ স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ায় এমন রোগ থাকলে সেগুলোর যথাযথ চিকিৎসাও নিশ্চিত করতে হবে।

স্ট্রোকের পর পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ

স্ট্রোকের পর অনেক রোগীর কথা বলা, হাঁটাচলা, গিলতে পারা কিংবা দৈনন্দিন কাজ করার ক্ষেত্রে সমস্যা দেখা দিতে পারে। চিকিৎসাগতভাবে স্থিতিশীল হওয়ার পর রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি, দৈনন্দিন কাজের প্রশিক্ষণ, কথা বলা ও গিলতে পারার থেরাপি এবং মানসিক সহায়তা দেওয়া হয়। এসব পুনর্বাসনের লক্ষ্য হলো রোগীর সক্ষমতা, স্বাধীনতা ও জীবনমান যতটা সম্ভব ফিরিয়ে আনা।

এ ক্ষেত্রে পরিবারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীকে সাহস দেওয়া, তাঁর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা এবং চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পরিকল্পনা অনুসরণে সহায়তা করা প্রয়োজন। কথা বলতে অসুবিধা হচ্ছে বলে তাঁর মতামত বা মর্যাদাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। পাশাপাশি রোগীর যত্ন নেওয়া পরিবারের সদস্যদের বিশ্রাম ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টিও গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশ্ব স্ট্রোক দিবসে প্রতিটি পরিবারের প্রস্তুতি থাকা দরকার—স্ট্রোকের লক্ষণগুলো জানা, স্থানীয় জরুরি নম্বর হাতের কাছে রাখা এবং প্রয়োজনে দ্রুত চিকিৎসাসেবা নেওয়া।

মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত দুর্বল হয়ে পড়া কিংবা কথা জড়িয়ে যাওয়াকে সাময়িক সমস্যা ভেবে এড়িয়ে যাবেন না। স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে অপেক্ষা নয়, অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিন। আপনার দ্রুত সিদ্ধান্ত একজন মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে।