ডিএনএ পরীক্ষায় পরিচয় শনাক্তের পর বাড়িতে পৌঁছাল চারজনের মরদেহ, মায়ের কবরের পাশে দাফন
স্বজনদের চোখের পানি যেন শুকিয়ে গেছে। প্রতিবেশীরা সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুতে যশোরের মনিরামপুরের মোহনপুর গ্রামে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিস্তব্ধ পরিবেশের মধ্যে স্বজনদের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠছে চারপাশ।
কক্সবাজারের ইনানীর টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে নিহত একই পরিবারের চার সদস্যের মরদেহ বুধবার (২৮ অক্টোবর) ভোরে যশোরের মনিরামপুর পৌর এলাকার মোহনপুর গ্রামে পৌঁছায়। তাঁরা হলেন নাহিদুর রহমান (৪১), তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজী (৩৬) এবং তাঁদের দুই শিশুকন্যা রোজাইনা ইনায়া (৭) ও মুনাইনা ইহানা (৩)।
দীর্ঘ ১০ দিন অপেক্ষার পর ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হয়। এরপর মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) বিকেল ৩টার দিকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গ থেকে নিহত ১০ জনের মরদেহ আনুষ্ঠানিকভাবে স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। দাফন সম্পন্ন করার জন্য প্রতিটি পরিবারকে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়।
একই পরিবারের নিহত ছয়জনের মরদেহ ওই পরিবারের স্বজন আমিনুর রহমানের কাছে এবং অপর পরিবারের চারজনের মরদেহ নাহিদুর রহমানের বড় ভাই জাহিদুর রহমানের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
১০ দিন পর মিলল পরিচয়
জাহিদুর রহমান জানান, তাঁর ছোট ভাই, ভাইয়ের স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানের মরদেহ হস্তান্তরের সময় উপস্থিত ছিলেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক আবদুল মান্নান, বিশেষ পুলিশ সুপার (সিআইডি) মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ, পুলিশ সুপার সাজেদুর রহমানসহ জেলা প্রশাসন, পুলিশ ও সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
তিনি বলেন, গত ১৭ অক্টোবর সকাল ৭টার দিকে রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তাঁর ছোট ভাই নাহিদুর রহমান, ভাবি আফসানা মতিন তানজী এবং দুই ভাতিজি নিখোঁজ ছিলেন। ওই দিনই রিসোর্টের একটি ওয়াশরুম থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পরদিন তাঁরা ঘটনাস্থলে গিয়ে উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলো নিজেদের স্বজনদের বলে ধারণা করেছিলেন। কিন্তু আগুনে মরদেহগুলো এমনভাবে পুড়ে গিয়েছিল যে, দেখে পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। পরে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে তাঁদের পরিচয় নিশ্চিত হয়।
মায়ের কবরের পাশে পাশাপাশি চার কবর
প্রিয়জনদের মরদেহ শনাক্ত হওয়ার খবর পাওয়ার পর থেকেই মোহনপুর গ্রামে শোকের প্রস্তুতি চলছিল। নাহিদুর রহমানের মায়ের কবরের পাশে পাশাপাশি চারটি কবর খুঁড়ে রাখা হয়। যে মায়ের কোলে মাথা রেখে একদিন নাহিদুরের জীবনের শেষ আশ্রয় হয়েছিল, সেই মায়ের কবরের পাশেই এবার চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন তিনি, তাঁর স্ত্রী ও দুই শিশুকন্যা।
নিহত নাহিদুর রহমানের অশীতিপর বৃদ্ধ বাবা মতিয়ার রহমান জানান, ক্যানসারে আক্রান্ত তাঁর স্ত্রী ২০১৬ সালে নাহিদুরের কোলে মাথা রেখে মারা যান। সেই স্মৃতির পর এবার ছেলেকে হারানোর শোকের সঙ্গে যোগ হলো পুত্রবধূ ও দুই নাতনিকে হারানোর অসহনীয় বেদনা।
বুধবার বিকেল ৩টায় বাঁধাঘাট ঈদগাহ মাঠে জানাজা শেষে নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজী এবং দুই শিশুকন্যাকে তাঁদের মায়ের কবরের পাশে দাফন করা হয়।
একসঙ্গে চারজনের এমন মৃত্যুতে পরিবারটির ওপর নেমে এসেছে অপূরণীয় শোক। মোহনপুর গ্রামের মানুষও শোকাহত স্বজনদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। কিন্তু যে চারজনের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনেরা, তাঁরা ফিরলেন নিথর দেহে—আর রেখে গেলেন আজীবন বয়ে বেড়ানোর মতো এক শূন্যতা।



