সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলায় সাবেক সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসান এবং অভিনেত্রী রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছে প্রসিকিউশন। আদালতের নির্দেশে গঠিত উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্সের প্রাথমিক তদন্তে তাঁদের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে এসেছে বলে জানানো হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) এ তথ্য জানান অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তবে এটি প্রাথমিক তদন্তের তথ্য; তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা এখনো আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
তদন্ত শেষ করতে আরও ছয় মাস সময়
সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্তের অগ্রগতি প্রতিবেদন হাইকোর্টে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিচারপতি শিকদার মাহমুদুর রাজী ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চে প্রতিবেদনটি দাখিল করা হয়। রাষ্ট্রপক্ষের সময় আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত শেষ করতে টাস্কফোর্সকে আরও ছয় মাস সময় দিয়েছেন আদালত। এ নিয়ে চতুর্থবারের মতো সময় পেল তদন্তকারী দল।
পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী ২৯ এপ্রিল তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। ওই দিন টাস্কফোর্স এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিষয়টির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট আইনজীবী জানিয়েছেন।
প্রাথমিক তদন্তে যেসব তথ্য
আদালতে দাখিল করা অগ্রগতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টাস্কফোর্সের সদস্যদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম ও প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহার সঙ্গে আলোচনায় সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব রোকেয়া প্রাচীর সংশ্লিষ্টতার প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা জানানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, প্রাথমিক তদন্তের তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে সংগৃহীত তথ্য ও আলামত পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (পিবিআই) তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হবে।
মামলার অগ্রগতি প্রতিবেদন উপস্থাপনের সময় রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল। তাঁর সঙ্গে ছিলেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল মোহাম্মদ আরশাদুর রউফ ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল নূর মোহাম্মদ আজমী। বাদীপক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। রিট আবেদনকারীর পক্ষে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ, ২৪ জনের জবানবন্দি
আদালতে শুনানি শেষে নিজ কার্যালয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল জানান, মামলার নতুন তদন্তভার পাওয়ার পর ২০২৪ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত টাস্কফোর্স মোট ৯০ জন সাক্ষীকে পুনরায় জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। এ সময় ২৪ জনের জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়েছে।
তদন্তে ডিজিটাল আলামতের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানান তিনি। অ্যাটর্নি জেনারেলের বক্তব্য অনুযায়ী, গত ৩০ আগস্ট বিভিন্ন ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছিলেন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনটিএমসির সাবেক পরিচালক জিয়াউল আহসানের বরিশালের বাসায় অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু ডিজিটাল আলামত জব্দ করেছে।
জব্দ করা আলামতের মধ্যে জিওলোকেশন-সংক্রান্ত তথ্য, এসএমএস এবং কল ডিটেইলস রেকর্ডের (সিডিআর) মুদ্রিত কপি ছিল বলে ওই বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়।
সহকারীর জিজ্ঞাসাবাদে কী উঠে এসেছে
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও জানান, জিয়াউল আহসানের একজন সহকারী, যিনি র্যাবের সদস্য ছিলেন, তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের সূত্রে হত্যাকাণ্ডে জিয়াউল আহসান ও একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে প্রাথমিক তথ্য পাওয়ার কথা প্রসিকিউটর তানভীর হাসান জোহা জানিয়েছিলেন।
পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলামও বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একই ধরনের বক্তব্য দেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল।
তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তের কাজ শেষ হলে সাগর-রুনি হত্যা মামলাসংক্রান্ত তথ্য পিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের কাছে হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে, পিবিআইয়ের তদন্তকারী দলের সদস্যরা সংশ্লিষ্ট আইনজীবী ও প্রসিকিউটরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন বলে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল। তাঁদের কাছে কী ধরনের আলামত রয়েছে, তা জানতে চাওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
অগ্রগতি প্রতিবেদনের এ অংশ তদন্তকারী কর্মকর্তা মো. আজিজুল হক লিখেছেন বলে আদালতকে জানানো হয়েছে।
২০২৪ সালে টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ
এর আগে ২০২৪ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সাগর-রুনি হত্যা মামলার তদন্ত থেকে র্যাবকে সরিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে উচ্চপর্যায়ের টাস্কফোর্স গঠনের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে ২০২৫ সালের ৬ এপ্রিলের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
পরে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করে। তবে নির্ধারিত তারিখে উচ্চ আদালতে অবকাশকালীন ছুটি থাকায় সেদিন এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি।
দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের তদন্তে নতুন তথ্য সামনে আসায় মামলাটির অগ্রগতির দিকে আবারও নজর তৈরি হয়েছে। তবে তদন্তের চূড়ান্ত ফলাফল, সংগৃহীত আলামতের যাচাই এবং আদালতে উপস্থাপিত প্রমাণের ভিত্তিতেই এ ঘটনায় কারও দায় নির্ধারিত হবে।



