গণভোটের রায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যাসহ বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের বিচার, জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের সংকট নিরসন এবং দুর্নীতি-চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে আগামী ৩১ অক্টোবর ঢাকা-খুলনা-কুষ্টিয়া লংমার্চ সফল করার আহ্বান জানিয়েছে ১১ দলীয় ঐক্য। সংগঠনটির নেতারা জানিয়েছেন, আগের দুই দফার কর্মসূচির ধারাবাহিকতায় এবার তৃতীয় পর্যায়ের লংমার্চ অনুষ্ঠিত হবে।
মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকালে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সভা শেষে বেলা সাড়ে ১১টায় সাংবাদিকদের সামনে কর্মসূচির বিস্তারিত তুলে ধরেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক।
ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় কার্যকর করা, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সারের সংকট দূর করা, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নের দাবিতে এই লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রশাসন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিও তোলা হবে।
মামুনুল হক জানান, নাগরিক জীবনের সংকট নিরসন এবং জনগণের ন্যায্য দাবি আদায়ে ১১ দলীয় ঐক্য দেশব্যাপী কর্মসূচি পালন করছে। এর আগে চট্টগ্রাম ও উত্তরাঞ্চলে দুটি লংমার্চ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় ৩১ অক্টোবর তৃতীয় লংমার্চের আয়োজন করা হচ্ছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করা এবং জুলাই গণহত্যা, শাপলা গণহত্যা, শরীফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডসহ সব হত্যার বিচার নিশ্চিত করার দাবিও কর্মসূচিতে গুরুত্ব পাবে।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, আগের দুটি কর্মসূচির মতো এবারও সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে লংমার্চ সফল হবে। ৩১ অক্টোবর সকাল ৭টায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে উদ্বোধনী সমাবেশের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি শুরু হবে। পথে বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি পালনের পর লংমার্চ কুষ্টিয়ায় গিয়ে শেষ হবে।
কর্মসূচি শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রশাসনের পক্ষ থেকে কর্মসূচিতে বাধা বা অপতৎপরতা না হওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। তবে কোনো পক্ষ বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে তা প্রতিহত করে লংমার্চ সফল করার ঘোষণা দেন তিনি।
প্রয়োজনে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ১১ দলীয় ঐক্য এখন পর্যন্ত সহনশীল কর্মসূচি পালন করছে বলে মন্তব্য করেন মামুনুল হক। তিনি বলেন, সংসদের ভেতরে ও বাইরে সরকারকে সহযোগিতা করার মানসিকতা নিয়ে বিরোধী দল দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু সরকারের আচরণে বিরোধীদের সহযোগিতা গ্রহণের আন্তরিকতা স্পষ্ট নয়। এ অবস্থায় জনগণের অধিকার আদায়ে প্রয়োজন হলে আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়া হবে।
জনগণের ইচ্ছা ও প্রত্যাশা উপলব্ধি করে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে উদ্বেগ
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়ে ১১ দলীয় ঐক্যের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান মামুনুল হক। নির্বাচন কমিশনের সচিব পর্যায়ে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, এ ধরনের পদক্ষেপ কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঠাকুরগাঁওয়ের উপনির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও তাঁদের উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশনকে নিরপেক্ষতা বজায় রেখে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ১১ দলীয় ঐক্য চুপ থাকবে না। প্রয়োজন হলে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বড় ধরনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
পুলিশের আইজিপির বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে পুলিশের মহাপরিদর্শকের সাম্প্রতিক বক্তব্যের সমালোচনা করে মামুনুল হক বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বা ক্রসফায়ার নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা একজন কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন বক্তব্য প্রত্যাশিত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে দেশবাসী হতভম্ব ও স্তম্ভিত বলে উল্লেখ করে দেশের সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর সফর নিয়েও প্রশ্ন
প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক রাষ্ট্রীয় সফরের প্রসঙ্গ তুলে মামুনুল হক বলেন, সফরসঙ্গীদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও রয়েছেন, যাঁদের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বের উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় সফরকে বিনোদনমূলক সফরের মতো করে আয়োজন করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে সরকারকে আরও দায়িত্বশীল হওয়ার আহ্বান জানান।
জাতীয় সংসদের আসন্ন চতুর্থ অধিবেশন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে সরকার বিরোধী দলকে সঙ্গে নিয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমাধানের উদ্যোগ নেবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। অধিবেশন শুরুর আগে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতারা আবারও বৈঠকে বসে পরবর্তী করণীয় ঠিক করবেন বলে জানান তিনি।
গোপালগঞ্জে লংমার্চ ঘিরে সতর্ক থাকার আহ্বান
লংমার্চের গাড়িবহর গোপালগঞ্জের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে মামুনুল হক বলেন, তাঁরা এ ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক থাকলে কর্মসূচি স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে বলে তাঁরা মনে করেন।
তিনি বলেন, গোপালগঞ্জের বহু ইসলামপন্থী ও দেশপ্রেমিক মানুষ লংমার্চে অংশ নেবেন। কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা অপতৎপরতা দেখা দিলে তা মোকাবিলায় তাঁরা প্রস্তুত রয়েছেন। একই সঙ্গে গোপালগঞ্জের প্রশাসনকে যথাযথ দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানান তিনি। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে এর দায় সরকার ও প্রশাসনকে নিতে হবে বলেও মন্তব্য করেন।
লংমার্চের বিভিন্ন স্থানে কর্মসূচি আয়োজনের বিষয়ে তিনি জানান, কয়েকটি সম্ভাব্য স্থান নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিশেষ করে জেলা স্কুল এলাকায় জায়গার স্বল্পতা এবং প্রবেশপথের সীমাবদ্ধতা বিবেচনায় নিয়ে চূড়ান্ত স্থান নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
ভারতের গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ
ভারতের এক গোয়েন্দা কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকের অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে মামুনুল হক বলেন, যাঁরা এ অভিযোগ করছেন, তাঁরাই এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবেন। তিনি দাবি করেন, ১১ দলীয় ঐক্য কোনো ষড়যন্ত্র বা চক্রান্তের সঙ্গে যুক্ত নয়। রাষ্ট্র সংস্কার, শহীদদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা, আধিপত্যবাদ মোকাবিলা এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো নির্ধারণের লক্ষ্যেই তাঁরা ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করছেন।
জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং দেশের ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণের আন্দোলনে ১১ দলীয় ঐক্যের পরিসর আরও বাড়বে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে ৩১ অক্টোবরের লংমার্চে দেশপ্রেমিক নাগরিক, গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন।
বৈঠকে যাঁরা উপস্থিত ছিলেন
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে ১১ দলীয় ঐক্যের বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতারা অংশ নেন।
উপস্থিত ছিলেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম; এলডিপির প্রেসিডেন্ট ও বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক; জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মিয়া গোলাম পরওয়ার; দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ; এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।
এ ছাড়া নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আমির আল্লামা আবু জাফর, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট একেএম আনোয়ারুল ইসলাম চান, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমির আবদুল মাজেদ আতহারী, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, জাগপার মহাসচিব অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বিডিপির সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম এবং বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলামসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।



