ইউক্রেন যুদ্ধে সেনাসংখ্যা বাড়াতে রাশিয়ায় অসুস্থ, শারীরিকভাবে দুর্বল ও অসহায় পুরুষদের জোর করে সামরিক বাহিনীতে নিয়োগের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংগঠন, সামরিক আইনজীবী ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, অর্থের প্রলোভনে সেনা নিয়োগের পাশাপাশি দেশটিতে ভয়ভীতি দেখানো, প্রতারণা ও জবরদস্তির মাধ্যমে সামরিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করানোর ঘটনাও বাড়ছে।
সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধ পঞ্চম বছরে প্রবেশের প্রেক্ষাপটে রাশিয়ার সেনা নিয়োগব্যবস্থায় এ ধরনের পরিবর্তনের অভিযোগ সামনে এসেছে। সম্মুখযুদ্ধে হতাহতের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং নতুন সেনা সংগ্রহের চাপের কারণে কর্তৃপক্ষের ওপর জনবল জোগাড়ের চাপ বাড়ছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
অসুস্থ ব্যক্তিকেও নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ির সামনে থেকে
প্রতিবেদনে পশ্চিম রাশিয়ার একটি শহরের পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তির ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর এক স্বজনের ভাষ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তি অসুস্থ ছিলেন। তাঁর রক্তনালিতে সমস্যা ছিল, মদ্যপানের অভ্যাসও ছিল। এমনকি ঠিকমতো হাঁটাচলাও করতে পারতেন না তিনি।
গত জুলাইয়ে কয়েকজন সাদাপোশাকধারী ব্যক্তি তাঁকে বাড়ির সামনে থেকে গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। পরে একটি কাগজে তাঁর স্বাক্ষর নেওয়া হয়। প্রথমে কাগজটিকে উপস্থিতির নোটিশ বলে জানানো হলেও পরে সেটি সামরিক বাহিনীতে যোগ দেওয়ার চুক্তি বলে জানা যায়।
বাড়ি ফেরার এক সপ্তাহ পর ওই ব্যক্তি নিখোঁজ হন। কয়েক দিন পর পরিবারের সদস্যদের ফোন করে জানান, তিনি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের লুহানস্ক অঞ্চলের একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রে রয়েছেন। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে তাঁর পরিবার জানতে পারে, যুদ্ধে তিনি নিখোঁজ হয়েছেন।
ঋণগ্রস্ত ও অসুস্থ ব্যক্তিরা বেশি ঝুঁকিতে
জোরপূর্বক সেনা নিয়োগসংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে কাজ করা রুশ সামরিক আইনজীবী আরতেম ক্লিগা সিএনএনকে বলেন, গ্রীষ্মের শুরু থেকে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। তাঁর মতে, ঋণগ্রস্ত, অসুস্থ এবং মদ্যপানের সমস্যায় ভুগছেন— এমন পুরুষেরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন।
রাশিয়ার পেনজা অঞ্চলেও গত জুনে জোরপূর্বক সেনা নিয়োগের অভিযোগ সামনে আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একটি নিয়োগকেন্দ্রের সামনে কয়েকজন নারী বাসে থাকা পুরুষদের ছেড়ে দেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। তবে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এসব অভিযোগকে ভুয়া বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
সেনা নিয়োগে আর্থিক পুরস্কার
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সেনা নিয়োগে সহায়তাকারীদের জন্য রাশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে আর্থিক পুরস্কারের ব্যবস্থা রয়েছে। রিয়াজান অঞ্চলের গভর্নর পাভেল মালকভ গত বছর জানিয়েছিলেন, চুক্তিভিত্তিক সেনা নিয়োগে সহায়তাকারীরা প্রত্যেক নিয়োগের জন্য ৫০ হাজার থেকে ৩ লাখ রুবল পর্যন্ত পেতে পারেন।
জার্মানির নিরাপত্তা বিশ্লেষক জানিস ক্লুগের মতে, এসব ঘটনা সরাসরি ক্রেমলিনের নির্দেশে ঘটছে— এমন প্রমাণ নেই। তবে রাশিয়ার জনবলসংকট মোকাবিলার চাপে কর্তৃপক্ষ এ ধরনের কর্মকাণ্ড উপেক্ষা করতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাশিয়ার সেনা সংগ্রহের ওপর চাপ বাড়ছে। আর সেই চাপের মধ্যে অসুস্থ ও আর্থিকভাবে বিপর্যস্ত ব্যক্তিদের জোর করে নিয়োগের অভিযোগ দেশটির সামরিক নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।



