দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগে মেহেরপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের পদ থেকে সরিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়েছিল ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহানকে। তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্তের ফল প্রকাশের আগেই তাকে রাজধানীর স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালক পদে পদায়ন করা হয়েছে। এ ঘটনায় হাসপাতালের চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ডা. শাহরিয়া শায়লার পদায়ন স্থগিত এবং মিটফোর্ড হাসপাতালের বর্তমান উপপরিচালক ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে স্বপদে বহাল রাখার দাবি জানিয়েছে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরাম (এনডিএফ)। সংগঠনটির সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. নজরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মাহমুদ হোসেন এক যৌথ বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের গত ১ সেপ্টেম্বরের এক প্রজ্ঞাপনে ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ওএসডি করা হয়। একই প্রজ্ঞাপনে তার স্থলে ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহানকে মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালক পদে বদলিপূর্বক পদায়ন করা হয়। প্রজ্ঞাপনে পদায়ন করা কর্মকর্তাদের ৬ সেপ্টেম্বরের মধ্যে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়। এতে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্মসচিব সাইফুল ইসলাম স্বাক্ষর করেন।
এর আগে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পান ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহান। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।
গত বছরের ২৬ এপ্রিল এক রোগীর স্বজনের সঙ্গে মেডিকেল অফিসার ডা. মাহাবুব রহমানের বাগ্বিতণ্ডার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহিলা ও শিশু ওয়ার্ডে রাউন্ড ও চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘোষণা দেওয়া হয়। এতে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে অনেক রোগীকে বেসরকারি ক্লিনিকে যেতে হয়। ওই ঘটনার পর হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
এ সময় সংবাদকর্মীরা বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাইলে হাসপাতালের সব বিষয়ে সাংবাদিকদের নজর দেওয়ার প্রয়োজন নেই—এমন মন্তব্য করার অভিযোগও ওঠে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়কের বিরুদ্ধে।
এ ছাড়া হাসপাতালের প্রায় সাড়ে ছয় কোটি টাকার টেন্ডারে দুর্নীতির অভিযোগও ওঠে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে স্থানীয়রা বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন ও মানববন্ধন করেন। গত বছরের ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত এক মানববন্ধনে হাসপাতালের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়কের অপসারণ দাবি করেন স্থানীয়রা।
মানববন্ধনে অভিযোগ করা হয়, হাসপাতালের প্রবেশপথ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে তত্ত্বাবধায়কের নিয়মিত অফিস না করা, রোগীদের প্রতি অনীহা এবং উগ্র আচরণের অভিযোগও তোলা হয়।
এ ছাড়া পদায়ন করা কর্মস্থলে যোগদান না করা এবং অনুমোদন ছাড়া অনুপস্থিত থাকার অভিযোগেও ডা. শাহরিয়া শায়লাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। পরে গত বছরের ১৬ নভেম্বর তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) করা হয়। তার স্থলে সাতক্ষীরার কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. বুলবুল কবিরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
প্রায় ১০ মাস পর এবার তাকে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ একটি সরকারি হাসপাতাল মিটফোর্ডের প্রশাসনিক পদে পদায়ন করা হলো।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পদায়ন স্থগিতের দাবি
ডা. শাহরিয়া শায়লার নতুন পদায়নের প্রতিবাদ জানিয়েছে এনডিএফ। গত রোববার সংগঠনটির দপ্তর সম্পাদক ডা. একেএম জিয়াউল হক স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, গত ১ সেপ্টেম্বরের প্রজ্ঞাপনে ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালকের পদ থেকে সরিয়ে ওএসডি করা হলেও এর সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। অন্যদিকে তার স্থলাভিষিক্ত ডা. শাহরিয়া শায়লা জাহানের বিরুদ্ধে মেহেরপুরে দায়িত্ব পালনকালে সাড়ে ছয় কোটি টাকার টেন্ডার দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়মসহ বিভিন্ন অভিযোগ ওঠে।
সংগঠনটির দাবি, এসব অভিযোগের পর জনআন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৫ সালের ১৬ নভেম্বর তাকে ওএসডি করা হয়েছিল। কিন্তু অভিযোগগুলোর তদন্ত শেষ করে ফলাফল প্রকাশের আগেই তাকে রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের প্রশাসনিক পদে পদায়ন করা হয়েছে।
এনডিএফ বলেছে, এ ধরনের পদায়নের ফলে প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে কী কারণে ওএসডি করা হয়েছে, সেটিও স্পষ্ট করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
সংগঠনটির দাবি, ডা. শাহরিয়া শায়লার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার পদায়ন স্থগিত করতে হবে এবং ডা. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে মিটফোর্ড হাসপাতালের উপপরিচালক পদে পুনর্বহাল করতে হবে।



