tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকনেপালে ভয়াবহ প্রলয়: লাশের পর লাশ, নিখোঁজ হাজারের বেশি

নেপালে ভয়াবহ প্রলয়: লাশের পর লাশ, নিখোঁজ হাজারের বেশি

কাঁদছে নেপাল। লাশের পর লাশ, নিখোঁজ অসংখ্য মানুষ। কাদামাটি ও ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েছে বাড়িঘর, হাটবাজার ও লোকালয়। মুহূর্তের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে গাড়ি, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ মানুষের সহায়-সম্পদের কোনো কিছুই রেহাই পায়নি। আপনজনের খোঁজে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে চারপাশ।

ভোতেকোশি ও লেন্দে নদীর ভয়াবহতায় হতবিহ্বল নেপালিরা যেন ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন। হলিউডের সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানানো এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ চোখের পলকে কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য প্রাণ ও মানুষের সাজানো সংসার। আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ ধস ও ভূমিধসের তাণ্ডবে প্রাণহানি এরই মধ্যে কয়েক শ ছাড়িয়েছে। নেপাল পুলিশ জানিয়েছে, কমপক্ষে ৩৫৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত হয়েছে। তবে নিখোঁজ রয়েছেন এক হাজারের বেশি মানুষ। নিহত ও আহতের মোট সংখ্যা দেড় হাজার ছাড়াতে পারে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে।

বিপুলসংখ্যক মানুষ কাদা ও পানির প্রবল স্রোতে ভেসে গেছেন। অনেকে ধ্বংসস্তূপ ও পলির নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। ফলে উদ্ধারকাজ যত এগোচ্ছে, প্রাণহানির প্রকৃত সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। নিহত, নিখোঁজ ও আহতদের মধ্যে বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য।

বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় পাহাড় থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নামে। এতে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের ভয়াবহ স্রোত তৈরি হয়ে ত্রিশূলী নদীর তীর উপচে পড়ে। চীন ও নেপালের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এই নদীটি ভোতেকোশি নামেও পরিচিত। ভয়াবহ স্রোতে ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ভেসে যায়।

কাঠমান্ডুভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্টের (আইসিমোড) বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, মাত্র আধা ঘণ্টায় ত্রিশূলী নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়। ভোতেকোশির উপনদী লেন্দে খোলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানান, গত ১৪ মাসে লেন্দে খোলা নদীতে এটি দ্বিতীয় বড় বন্যা। এবার হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে নদীর গতিপথ আটকে দেয়। পরে সেই প্রাকৃতিক বাধা ভেঙে গিয়ে বিপুল পানির স্রোত নিচের দিকে ধেয়ে আসে।

ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, প্রাণ বাঁচাতে মানুষ উঁচু স্থানের দিকে ছুটছেন। কিন্তু এত দ্রুত কাদা ও পানির স্রোত নেমে আসে যে অনেকেই নিরাপদ স্থানে যাওয়ার সুযোগ পাননি। মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ স্রোত তাদের ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক রয়েছেন। চীনের তিব্বত অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমও সেখানে বেশ কয়েকজনের মৃত্যুর খবর দিয়েছে এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ থাকার কথা জানিয়েছে।

প্রাথমিকভাবে ভূমিকম্পকে আকস্মিক বন্যার সম্ভাব্য কারণ মনে করা হলেও পরে তা নাকচ করা হয়েছে। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) ও নেপালের আবহাওয়া ও জলবিজ্ঞান বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, পাহাড় থেকে বিশাল বরফখণ্ড ও পাথরের ধস নামার ফলেই এই বিপর্যয় সৃষ্টি হয়েছে। ধসের সময় বিপুল পরিমাণ পাথর ও মাটি নদীতে পড়ে পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত করে। পরে সেই বাধা ভেঙে কাদা, পানি ও ধ্বংসাবশেষের বিধ্বংসী স্রোত তৈরি হয়। জলবায়ু পরিবর্তন, হিমবাহ গলে যাওয়া, হিমবাহ হ্রদের পানি উপচে পড়া কিংবা অতিবৃষ্টির কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা।

পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর ডিজাস্টার স্টাডিজের পরিচালক বসন্ত রাজ অধিকারী জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বা শুক্রবার বন্যার দ্বিতীয় ও তৃতীয় ঢেউ আঘাত হানার ঝুঁকি রয়েছে। ভারী বৃষ্টিপাত না থাকলেও নতুন ভূমিধসের আশঙ্কা রয়েছে বলে তিনি সতর্ক করেছেন।

দুর্যোগের পর আক্রান্ত অঞ্চলগুলো কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। হেলিকপ্টারে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। উদ্ধারকর্মীরা কাদা ও পানির মধ্য দিয়ে জীবিতদের সন্ধান করছেন। পাহাড়ের চূড়ায় আশ্রয় নেওয়া বহু পর্যটককেও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। কৈলাস-মানস সরোবরে তীর্থযাত্রার উদ্দেশ্যে বিপুলসংখ্যক মানুষ ওই অঞ্চলে অবস্থান করায় হতাহত ও নিখোঁজের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

মায়ের খোঁজে অনীক

নেপালের ভয়াবহ দুর্যোগে স্বজনদের উৎকণ্ঠার চিত্র ফুটে উঠেছে ভারতের পর্যটকদের ক্ষেত্রেও। পশ্চিমবঙ্গ থেকে যাওয়া ৩২ জনের একটি পর্যটক দলের সদস্যদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মোট ২৮৮ জন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

হুগলির চন্দননগরের শিপ্রা রায়ের ছেলে অনীক জানান, বুধবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে মায়ের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল। এরপর থেকে আর কোনো যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। ৬০ বছর বয়সী শিপ্রা ২১ আগস্ট বাসে করে কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন।

একই দলের সঙ্গে ছিলেন কলকাতার রিনা ব্যানার্জী। তাঁর ভাগনে দ্বৈপায়ন মুখার্জী জানান, রোববার রাত সাড়ে ১১টার দিকে শেষবার রিনার সঙ্গে কথা হয়েছিল। এরপর আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

পশ্চিমবঙ্গের আরও কয়েকটি জেলার পর্যটকও ওই দলে ছিলেন। অন্যদিকে, নেপালে থাকা স্বজনদের খোঁজ না পেয়ে উদ্বেগে রয়েছেন আরও অনেক পরিবার। আরামবাগের সৌভাগ্য দত্ত জানান, তাঁর মা ২৪ আগস্ট অন্য একটি দলের সঙ্গে নেপালে গেছেন। বুধবার দুর্যোগের খবর পাওয়ার পর থেকে তিনি মায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, কিন্তু ফোনে পাওয়া যাচ্ছে না।

‘চোখের পলকে ভেসে গেল স্ত্রী-সন্তান’

নিজের চোখের সামনে স্ত্রী ও সন্তানকে হারানোর বর্ণনা দিয়েছেন নেপালের নুয়াকোটের ত্রিশূলী বাজারের এক কাপড় ব্যবসায়ী। তিনি জানান, তিব্বত সীমান্তে নদীর বাঁধ ভেঙে যাওয়ার খবর পেয়ে প্রশাসনের লোকজন দ্রুত সবাইকে উঁচু স্থানে চলে যেতে বলেছিলেন। কিন্তু সতর্কবার্তা পাওয়ার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই কাদা ও পানির বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ে।

তাঁর স্ত্রী ও ছেলে চোখের পলকে স্রোতে ভেসে যান। এরপর তাদের আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, ভোতেকোশি নদীর উপনদীতে হিমবাহ ধসে পানি আটকে যাওয়ার পর সেই বাধা ভেঙেই এই ভয়াবহ স্রোতের সৃষ্টি হয়।

রাসুয়া জেলার প্রধান শুল্ক কর্মকর্তা রাজেন্দ্র ধুঙ্গানা জানান, তিনি প্রায় ১০০ মিটার উঁচু ঢেউয়ের মতো পানি ধেয়ে আসতে দেখেছেন। মুহূর্তের মধ্যে একটি পুরো বাজার সেই স্রোতে ভেসে যায়। রাসুয়া, নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন কয়েক মিটার গভীর কাদা ও পলির নিচে চাপা পড়ে আছে। প্রিয়জন হারানো শত শত মানুষ ধ্বংসস্তূপের দিকে তাকিয়ে নিখোঁজ স্বজনদের ফিরে আসার অপেক্ষায় রয়েছেন।

বাংলাদেশের সহায়তার আশ্বাস

নেপালের ভয়াবহ ভূমিধস ও আকস্মিক বন্যায় প্রাণহানির ঘটনায় গভীর শোক ও সমবেদনা জানিয়েছে বাংলাদেশ। দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় যেকোনো ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে ঢাকা। প্রয়োজনে উদ্ধারকাজ ও চিকিৎসা সহায়তায় বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও মেডিকেল টিম পাঠানোর প্রস্তুতি নিতে প্রধানমন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দিয়েছেন।

নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ ও দেশটির জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শোকবার্তায় বলেন, ভয়াবহ বন্যায় বিপুল প্রাণহানির ঘটনায় তিনি গভীরভাবে শোকাহত ও ব্যথিত। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে তিনি বলেন, এই কঠিন সময়ে বাংলাদেশের চিন্তা ও প্রার্থনা নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ও তাদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানালের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে গভীর শোক জানান এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

ফোনালাপে নেপালে কোনো বাংলাদেশি নাগরিক হতাহত হয়েছেন কি না, সে বিষয়েও জানতে চান পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এখন পর্যন্ত কোনো বাংলাদেশি নাগরিকের হতাহত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি।

নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বাংলাদেশের সংহতি ও সহযোগিতার প্রস্তাবের জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, নেপালের কর্তৃপক্ষ এখনো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণ করছে। পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের পর প্রয়োজন হলে নির্দিষ্ট সহায়তার বিষয়ে বাংলাদেশকে জানানো হবে।

এদিকে নেপালের ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। নিহতদের স্মরণে সংসদ সদস্যরা এক মিনিট নীরবতা পালন করেন। পরে নিহতদের বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করে মোনাজাত পরিচালনা করেন ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ।