২০২৫ সালে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে জড়িত দেশব্যাপী মোট ৬৪৫টি সহিংস ঘটনার তথ্য নথিভুক্ত করেছে পুলিশ। এর মধ্যে ৭১টি ঘটনাকে ‘সাম্প্রদায়িক’ এবং বাকি ৫৭৪টি ঘটনাকে ‘অসাম্প্রদায়িক’ বা সাধারণ অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম পুলিশ সদর দফতরের এক বছরব্যাপী পর্যালোচনার ভিত্তিতে এসব তথ্য প্রকাশ করেন।
প্রেস উইং জানায়, প্রতিবেদনটি ফার্স্ট ইনফরমেশন রিপোর্ট (এফআইআর), সাধারণ ডায়েরি (জিডি), চার্জশিট এবং দেশব্যাপী চলমান তদন্তের হালনাগাদ তথ্যের ভিত্তিতে প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রতিটি ঘটনাই উদ্বেগজনক হলেও অধিকাংশ ঘটনা সাম্প্রদায়িক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়। ভূমি বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতাই এসব ঘটনার প্রধান কারণ।
প্রেস উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত ৭১টি ঘটনার মধ্যে রয়েছে—মন্দির ভাঙচুর ৩৮টি, অগ্নিসংযোগ ৮টি, মন্দিরে চুরি ১টি, হত্যা ১টি এবং অন্যান্য ২৩টি ঘটনা (প্রতিমা ভাঙার হুমকি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক পোস্ট ইত্যাদি)। এসব ঘটনায় ৫০টি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং ৫০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
অন্যদিকে, অসাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত ৫৭৪টি ঘটনার মধ্যে রয়েছে—অস্বাভাবিক মৃত্যু ১৭২টি, চুরি ১০৬টি, ধর্ষণ ৫৮টি, প্রতিবেশী বিরোধ ৫১টি, ভূমি বিরোধ ২৩টি, পূর্ব শত্রুতা ২৬টি এবং অন্যান্য ১৩৮টি অপরাধ। এসব ঘটনায় ৩৯০টি নিয়মিত মামলা ও ১৫৪টি অস্বাভাবিক মৃত্যু (ইউডি) মামলা দায়ের করা হয়েছে। গ্রেপ্তার করা হয়েছে মোট ৪৯৮ জনকে। অন্যান্য অপরাধের মধ্যে অপহরণ, ভীতি প্রদর্শন ও চাঁদাবাজির ঘটনাও রয়েছে।
প্রেস উইং জানায়, অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে সাম্প্রদায়িক হিসেবে চিহ্নিত ঘটনাগুলো মূলত ধর্মীয় উপাসনালয় বা প্রতিমা ভাঙচুর ও অপবিত্রতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। বিপরীতে, সংখ্যালঘু ব্যক্তি বা সম্পত্তিকে প্রভাবিত করা অধিকাংশ ঘটনা ধর্মীয় বিদ্বেষ নয়, বরং সামাজিক ও অপরাধমূলক দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত—যার মধ্যে রয়েছে ভূমি ও প্রতিবেশী বিরোধ, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, চুরি, যৌন সহিংসতা এবং ব্যক্তিগত শত্রুতা।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব অপরাধই গুরুতর এবং জবাবদিহিতা দাবি করে; তবে তথ্য প্রমাণ করে যে সংখ্যালঘু ভুক্তভোগীদের সঙ্গে জড়িত অধিকাংশ ঘটনা সাম্প্রদায়িক শত্রুতার ফল নয়। সঠিক শ্রেণিবিন্যাস বিভ্রান্তি ও ভুল তথ্য প্রতিরোধে সহায়ক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ নিশ্চিত করে।
সরকার পুনর্ব্যক্ত করেছে যে, বাংলাদেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সকল ধর্মাবলম্বীর সমান অধিকারের দেশ। প্রতিটি সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সাংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব। উপাসনালয় সুরক্ষা, উসকানি প্রতিরোধ, অপরাধে দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং গুজব থেকে সত্য আলাদা করা সামাজিক সম্প্রীতির জন্য অপরিহার্য।
প্রেস উইং আরও জানায়, জাতীয় পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিবছর সহিংস অপরাধে গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ প্রাণ হারান। প্রতিটি প্রাণহানি একটি ট্র্যাজেডি। তবে এসব পরিসংখ্যানের প্রেক্ষাপট বোঝা জরুরি, কারণ সহিংস অপরাধ ধর্ম বা জাতিগত বিভেদ ছাড়াই সব সম্প্রদায়কে প্রভাবিত করে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের কার্যক্রম উল্লেখযোগ্য। শত শত মামলা দায়ের, বহু গ্রেপ্তার এবং চলমান তদন্ত রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগ ও জনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রতিশ্রুতিকে প্রতিফলিত করে—বিশেষত সাম্প্রদায়িক সংবেদনশীলতার ক্ষেত্রে।
প্রেস উইংয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, বিদ্যমান সূচকগুলো ইঙ্গিত দেয় যে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে উন্নতি হচ্ছে। বাড়তি পুলিশিং, উন্নত গোয়েন্দা সমন্বয়, দ্রুত প্রতিক্রিয়া ও জবাবদিহিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।



