শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ, দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন, নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণসহ আট দফা দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। এসব দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) জাতীয় প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেছে সংগঠনটি।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংগঠনের সভাপতি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যান সংসদ সদস্য মো. সেলিম ভূঁইয়া।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা। অথচ চাকরির নিরাপত্তা, আর্থিক নিশ্চয়তা ও সামাজিক মর্যাদার ক্ষেত্রে তাঁরা নানা বৈষম্যের শিকার। শিক্ষাব্যবস্থার উন্নয়ন এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনমান পরিবর্তনে চাকরি জাতীয়করণের কোনো বিকল্প নেই।
সংবাদ সম্মেলনে উত্থাপিত আট দফা দাবি হলো—
১. শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণ: দেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের চাকরি জাতীয়করণের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, দেশের প্রায় ৯৭ শতাংশ শিক্ষার দায়িত্ব পালন করছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অথচ এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা চাকরির নিরাপত্তা ও আর্থিক সুযোগ-সুবিধায় পিছিয়ে রয়েছেন।
জাতীয়করণের সম্ভাব্য আর্থিক হিসাব তুলে ধরে সংগঠনটি জানায়, বেতন-ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, বাড়িভাড়া, দুটি উৎসব ভাতা ও বৈশাখী ভাতাসহ এ খাতে বছরে সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ২৬ হাজার ৩৭৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের বেতন, সেশন চার্জ, প্রতিষ্ঠানের সম্পদ থেকে আয়, সঞ্চিত অর্থের সুদ ও রিজার্ভ ফান্ড থেকে বছরে প্রায় ৮ হাজার ৪০০ কোটি টাকা আয়ের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সংগঠনটির হিসাব। তাদের দাবি, বিদ্যমান সরকারি ব্যয় ও সম্ভাব্য আয় সমন্বয় করলে জাতীয়করণে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয় দাঁড়াবে বছরে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা।
২. দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল বাস্তবায়ন: শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য দ্রুত নবম জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকরের দাবি জানানো হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ১৯৮০ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান শিক্ষক-কর্মচারীদের ৫০ শতাংশ বেতন প্রদানের মাধ্যমে জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করেন। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বেতন স্কেল পরিবর্তিত হলেও সব পর্যায়ের শিক্ষক-কর্মচারী সমানভাবে সুবিধা পাননি।
সংগঠনটির দাবি, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করতে হবে। এ লক্ষ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রায় ৬৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
৩. নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তকরণ: দীর্ঘদিন ধরে বিনা বেতনে দায়িত্ব পালন করা নন-এমপিও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের দ্রুত এমপিওভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। তাদের মতে, শিক্ষক সমাজের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছাড়া শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। তাই যোগ্য ও অন্তর্ভুক্তির অপেক্ষায় থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।
৪. বদলিপ্রত্যাশী শিক্ষকদের দ্রুত বদলি: শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বদলি সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়েছে ঐক্যজোট। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, হাজার হাজার শিক্ষক নিজ উপজেলা, জেলা কিংবা বিভাগের বাইরে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে চাকরি করছেন। এতে তাঁরা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার পাশাপাশি নানা পারিবারিক ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন।
বদলির জন্য চালু করা সফটওয়্যারে ত্রুটি রয়েছে উল্লেখ করে সংগঠনটি জানায়, আবেদন গ্রহণ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে বদলির আদেশ দেওয়া হচ্ছে না। তাই সফটওয়্যারের ত্রুটি সংশোধন করে আবেদন নিষ্পত্তি এবং দ্রুত বদলির আদেশ প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।
৫. শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদান: বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ উৎসব ভাতা পান। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই অর্থ দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে যথাযথভাবে ঈদ উদযাপন করা কঠিন বলে মনে করে সংগঠনটি। তাই শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের শতভাগ উৎসব ভাতা প্রদানের দাবি জানানো হয়েছে।
৬. সরকারি নিয়মে বাড়িভাড়া প্রদান: বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া পান। সংগঠনটির মতে, বর্তমান বাজারদরে এই অর্থ দিয়ে উপযুক্ত বাসস্থান ভাড়া নেওয়া কঠিন। কর্মস্থলে বসবাসের জন্য বাড়িভাড়া দিতে গিয়ে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আর্থিক সংকটে পড়ছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী বাড়িভাড়া প্রদানের দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
৭. চাকরির বয়সসীমা ৬৫ বছর নির্ধারণ: শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসরের বয়সসীমা ৬০ থেকে বাড়িয়ে ৬৫ বছর করার দাবি জানানো হয়েছে। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে চাকরির অবসরের বয়সসীমাও বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য ক্ষেত্রে ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরির সুযোগ রয়েছে। অভিজ্ঞ শিক্ষকদের জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগাতে তাঁদের চাকরির বয়সসীমা ৬৫ বছর করা প্রয়োজন বলে মনে করে সংগঠনটি।
৮. ১ম থেকে ১২তম এনটিআরসিএ সনদধারীদের নিয়োগ: প্রথম থেকে দ্বাদশ শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ সনদধারীদের নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে নিয়োগের দাবি জানিয়েছে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোট। লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বিগত সরকারের সময়ে নিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক সনদধারী বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। তাঁদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে নিয়োগের অপেক্ষায় রয়েছেন।
নির্বাচনের আগে প্রধানমন্ত্রী এসব সনদধারীকে নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছিলেন উল্লেখ করে সংগঠনটি সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।



