tanaka
প্রচ্ছদআন্তর্জাতিকযুক্তরাষ্ট্রে আজ মধ্যবর্তী নির্বাচন, ট্রাম্পের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভোট

যুক্তরাষ্ট্রে আজ মধ্যবর্তী নির্বাচন, ট্রাম্পের ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভোট

যুক্তরাষ্ট্রে আজ মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত হচ্ছে বহুল আলোচিত মধ্যবর্তী নির্বাচন। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হবে দেশটির কংগ্রেসের ক্ষমতার ভারসাম্য। একই সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নীতিনির্ধারণের গতিপথও অনেকটা নির্ভর করবে ভোটের ফলাফলের ওপর। সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত না হলেও, এই ভোটের মাধ্যমে মার্কিন প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব কতটা থাকবে, তা স্পষ্ট হবে।

বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্র যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির রাষ্ট্র পরিচালনার সর্বোচ্চ দায়িত্বে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের হাতে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত নয়। আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট অনুমোদন, সামরিক খাতে ব্যয় নির্ধারণ এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে দেশটির আইনসভা কংগ্রেস।

মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) ৪৩৫টি আসনের সবকটিতে এবার ভোট গ্রহণ করা হচ্ছে। বর্তমানে এই কক্ষে অল্প ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকান পার্টি। অন্যদিকে, উচ্চকক্ষ সিনেটের ১০০টি আসনের মধ্যে ৩৫টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে সিনেটে ৫৩-৪৭ ব্যবধানে এগিয়ে রয়েছে ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টি।

কংগ্রেসের দুই কক্ষের পাশাপাশি ৩৯টি অঙ্গরাজ্য ও অঞ্চলে গভর্নর পদ এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের হাজার হাজার পদেও ভোট দিচ্ছেন মার্কিন নাগরিকরা।

কেন অনুষ্ঠিত হয় মধ্যবর্তী নির্বাচন?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। তবে কংগ্রেসের দুই কক্ষের সদস্যদের মেয়াদ এক নয়। প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যরা দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ঠিক দুই বছর পর, অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে কংগ্রেসের আসনগুলোতে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেটিই মধ্যবর্তী নির্বাচন বা মিডটার্ম ইলেকশন নামে পরিচিত। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট পদে কোনো ভোট হয় না। বরং ভোটাররা পরবর্তী দুই বছরের জন্য কংগ্রেসে তাঁদের প্রতিনিধিত্ব করবেন এমন ব্যক্তিদের নির্বাচিত করেন।

তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের গুরুত্ব কেবল জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দলের কর্মকাণ্ডের প্রতি জনগণের সমর্থন কিংবা অসন্তোষের প্রতিফলন ঘটে।

প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোটাররা পরবর্তী চার বছরের জন্য রাষ্ট্রপ্রধান বেছে নেন। আর মধ্যবর্তী নির্বাচনে তাঁরা মূল্যায়ন করেন, ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রেসিডেন্ট ও তাঁর দল কতটা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পেরেছে। এ কারণে মধ্যবর্তী নির্বাচনকে অনেক সময় ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা ও রাজনৈতিক অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কেন এবারের ভোটকে ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণের নির্বাচন বলা হচ্ছে?

বর্তমানে হোয়াইট হাউসের পাশাপাশি মার্কিন কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণও রিপাবলিকান পার্টির হাতে। ফলে আইন প্রণয়ন থেকে শুরু করে বাজেট অনুমোদন—বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ট্রাম্প প্রশাসন দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবিধা পাচ্ছে।

অন্যদিকে, বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য এবারের নির্বাচনে কংগ্রেসের অন্তত একটি কক্ষের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়া। এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও নীতির ওপর আইনি এবং রাজনৈতিক নজরদারি বাড়াতে চায় দলটি।

কংগ্রেসের কোনো একটি কক্ষে রিপাবলিকানরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে নতুন আইন পাস, বাজেট অনুমোদন, শুল্কনীতি এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পদক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বিরোধী দলের সঙ্গে সমঝোতা করতে হতে পারে। একই সঙ্গে প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে কংগ্রেসের তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগও বাড়বে ডেমোক্র্যাটদের।

এবারের নির্বাচন এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিয়ে জনমনে উদ্বেগ রয়েছে। এর পাশাপাশি ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদের শেষ দুই বছরের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও এই নির্বাচনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে ভোটের ফলাফল আগামী দিনের আইন প্রণয়ন ও সরকারের নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।

এদিকে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশটির বিচার বিভাগের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কয়েক দশকের প্রচলিত রীতির বাইরে গিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের বিচার বিভাগ নির্বাচনী বিরোধে সরাসরি হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সাধারণত রাজনৈতিক দল বা কোনো প্রার্থীর পক্ষে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা ব্যবহারের অভিযোগ এড়াতে নির্বাচনী বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নেয় মার্কিন বিচার বিভাগ।

ভোটারদের বিবেচনায় যেসব ইস্যু

গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মার্কিন ভোটারদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাড়তি খরচ নিয়ে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ নির্বাচনী প্রচারণায় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি ট্রাম্প প্রশাসনের ইরান যুদ্ধসংক্রান্ত নীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সম্পৃক্ততা নিয়েও ভোটারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অভিবাসন নীতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত প্রসার ও এর নিয়ন্ত্রণে আইন প্রণয়নের বিষয়গুলোও নির্বাচনী আলোচনায় গুরুত্ব পাচ্ছে।

বিভিন্ন সাম্প্রতিক জনমত জরিপের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, মিশিগান, টেক্সাস, কানসাস, মেইন ও ওহাইওর মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তবে আইওয়াসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গরাজ্যে দুই দলের প্রার্থীদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কেন এত হিসাব-নিকাশ?

মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবকটিতেই ভোট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বর্তমানে এই কক্ষে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম সংখ্যা। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটদের আসন ২১৪টি। এ ছাড়া একজন স্বতন্ত্র সদস্য রয়েছেন এবং কয়েকটি আসন শূন্য রয়েছে।

এই সমীকরণে প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে রিপাবলিকানদের প্রতিটি আসনই গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ডেমোক্র্যাটরা মাত্র কয়েকটি আসনে জয় পেলেই কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার সুযোগ পাবে।

সিনেটের ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনী হিসাব। ১০০ সদস্যের এই কক্ষে সিনেটররা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন। তবে প্রতি দুই বছর পরপর এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এবার ৩৫টি আসনে ভোট হচ্ছে। ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া।

সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল শুধু কংগ্রেসের আসনসংখ্যার হিসাবই বদলে দেবে না, বরং আগামী দুই বছর যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গতিপথও নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। ভোট গণনা শেষে স্পষ্ট হবে, কংগ্রেসের দুই কক্ষেই রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকবে, নাকি ডেমোক্র্যাটদের হাতে ক্ষমতার নতুন ভারসাম্য তৈরি হবে।